01
🎯 Level 1
০১. প্রথম পানিপথের যুদ্ধ কখন হয়? (মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমটিও: ১৩; স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল টেকনিশিয়ান: ২০)
✅ সঠিক উত্তর:গ. ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে
ব্যাখ্যা:
"উত্তর: গ
◈ সঠিক উত্তর: ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ (২১ এপ্রিল)।
◈ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
❖ প্রথম পানিপথের যুদ্ধ (First Battle of Panipat) সংঘটিত হয় ২১ এপ্রিল ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে, ভারতের বর্তমান হরিয়ানা রাজ্যের পানিপথে।
❖ এই যুদ্ধে মধ্য এশীয় তুর্কি-মোঙ্গল বংশোদ্ভূত সম্রাট জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর দিল্লি সালতানাতের লোদি বংশের সর্বশেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করেন।
❖ যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদি নিহত হন এবং দিল্লিতে লোদি বংশের শাসনের অবসান ঘটে। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
❖ পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের বাহিনী কামান, বারুদচালিত আগ্নেয়াস্ত্র, অশ্বারোহী বাহিনীর দ্রুত আক্রমণ এবং বিশেষ যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করে। এই সম্মিলিত সামরিক কৌশল বাবরের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১. মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের জীবন ও পরিচিতি
❖ পূর্ণ নাম: জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর (Zahir-ud-din Muhammad Babur)।
❖ জন্ম: ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৪৮৩ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ জন্মস্থান: আন্দিজান, ফারগানা উপত্যকা, বর্তমান উজবেকিস্তান।
❖ মৃত্যু: ২৬ ডিসেম্বর ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ মৃত্যুস্থান: আগ্রা, ভারত।
❖ পিতা: উমর শেখ মির্জা দ্বিতীয়।
❖ মাতা: কুতলুগ নিগার খানম।
❖ রাজবংশ: তিমুরীয় বা Timurid।
❖ মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা: ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ ভারতে শাসনকাল: ১৫২৬–১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ উত্তরসূরি: সম্রাট হুমায়ুন।
❖ বিখ্যাত গ্রন্থ: বাবরনামা (Baburnama)।
❖ গ্রন্থের মূল ভাষা: চাগতাই তুর্কি (Chagatai Turkish)।
❖ বাবর ছিলেন পিতার দিক থেকে তিমুরের বংশধর এবং মাতার দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর।
২. বাবরের প্রাথমিক জীবন ও সামরিক উত্থান
◉ ১৪৯৪ সাল — ফারগানার শাসন লাভ
❖ বাবরের পিতা উমর শেখ মির্জার মৃত্যুর পর মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি ফারগানার শাসনভার গ্রহণ করেন।
❖ ফারগানা ছিল মধ্য এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল, যা বর্তমানে প্রধানত উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের মধ্যে বিস্তৃত।
◉ সমরকন্দ দখলের চেষ্টা
❖ বাবর তরুণ বয়স থেকেই সমরকন্দ দখল করার চেষ্টা করেন।
❖ তিনি কয়েকবার সমরকন্দ দখল করলেও উজবেক নেতা মুহাম্মদ শায়বানি খান এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীর কারণে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেননি।
◉ ১৫০৪ সাল — কাবুল দখল
❖ মধ্য এশিয়ায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারানোর পর বাবর আফগানিস্তানের দিকে অগ্রসর হন।
❖ ১৫০৪ সালে তিনি কাবুল দখল করেন এবং সেখানে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
❖ পরবর্তী সময়ে কাবুল তাঁর ভারত অভিযান পরিচালনার প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
৩. প্রথম পানিপথের যুদ্ধের রাজনৈতিক পটভূমি
❖ ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে উত্তর ভারতে দিল্লি সালতানাতের লোদি বংশ শাসন করছিল।
❖ লোদি রাজবংশ (Lodi Dynasty) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৪৫১ খ্রিষ্টাব্দে।
❖ এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বহলুল লোদি (Bahlul Lodi)।
❖ লোদি বংশের প্রধান শাসকেরা ছিলেন—
১. বহলুল লোদি (১৪৫১–১৪৮৯): লোদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।
২. সিকান্দার লোদি (১৪৮৯–১৫১৭): সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ শাসক; আগ্রা নগর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত।
৩. ইব্রাহিম লোদি (১৫১৭–১৫২৬): লোদি বংশের সর্বশেষ সুলতান।
❖ ইব্রাহিম লোদি কেন্দ্রীয় শাসকের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চাইলে আফগান অভিজাতদের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তুষ্ট হয়।
❖ পাঞ্জাবের গভর্নর দৌলত খান লোদি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে তাঁর বিরোধ বৃদ্ধি পায়।
❖ এই রাজনৈতিক অস্থিরতা বাবরের উত্তর ভারতে অভিযানের সুযোগ তৈরি করে।
৪. ইব্রাহিম লোদির জীবন ও পরিচিতি
❖ পূর্ণ নাম: ইব্রাহিম খান লোদি (Ibrahim Khan Lodi)।
❖ জন্ম: আনুমানিক ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ মৃত্যু: ২১ এপ্রিল ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ মৃত্যুস্থান: পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্র।
❖ পিতা: সিকান্দার লোদি।
❖ পিতামহ: বহলুল লোদি।
❖ রাজবংশ: লোদি।
❖ জাতিগত পরিচয়: আফগান বা পশতুন।
❖ শাসনকাল: ১৫১৭–১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ রাজধানী: দিল্লি।
❖ ঐতিহাসিক পরিচিতি: দিল্লি সালতানাতের সর্বশেষ সুলতান।
❖ পরাজিত হন: বাবরের কাছে।
❖ পরাজয়ের যুদ্ধ: প্রথম পানিপথের যুদ্ধ।
৫. বাবরের ভারত অভিযানের ঘটনাপ্রবাহ
◉ ১৫২৫ সাল — চূড়ান্ত ভারত অভিযানের সূচনা
❖ বাবর কাবুল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে তাঁর চূড়ান্ত অভিযান শুরু করেন।
❖ তিনি পাঞ্জাব অঞ্চলে অগ্রসর হয়ে লাহোরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
❖ এরপর তিনি দিল্লির দিকে অগ্রসর হন।
◉ ১৫২৬ সালের এপ্রিল — পানিপথে অবস্থান
❖ বাবর পানিপথ অঞ্চলে পৌঁছে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করেন।
❖ তিনি যুদ্ধের জন্য কামান, অশ্বারোহী বাহিনী এবং প্রতিরক্ষামূলক গাড়ির সারি সাজান।
❖ তাঁর বাহিনীকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে স্থাপন করেন।
৬. দুই বাহিনীর সামরিক শক্তি
❖ বাবরের বাহিনী
✦ আনুমানিক সৈন্যসংখ্যা — ১২,০০০–১৫,০০০; ঐতিহাসিক সূত্রভেদে ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়।
✦ কামান — আনুমানিক ২০–২৪টি বলে একটি প্রচলিত হিসাব রয়েছে।
✦ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি — অশ্বারোহী বাহিনী, তিরন্দাজ, কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র।
✦ প্রধান সেনাপতি — বাবর।
❖ ইব্রাহিম লোদির বাহিনী
✦ সৈন্যসংখ্যা — বাবরের বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি।
✦ কোনো কোনো বিবরণে শিবির-অনুসারীসহ প্রায় ১,০০,০০০ জনের উল্লেখ পাওয়া যায়; প্রকৃত যোদ্ধার সংখ্যা ছিল কম।
✦ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি — পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী এবং যুদ্ধহাতি।
✦ প্রচলিত হিসাবে প্রায় ১,০০০ যুদ্ধহাতি ছিল।
✦ প্রধান সেনাপতি — ইব্রাহিম লোদি।
❖ সৈন্যসংখ্যা ও কামানের নির্দিষ্ট পরিমাণ বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে বাবরের তুলনামূলক ছোট বাহিনীর বিরুদ্ধে ইব্রাহিম লোদির বৃহৎ বাহিনী অংশ নিয়েছিল, এ বিষয়ে ঐতিহাসিক বিবরণে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে।
৭. বাবরের বিখ্যাত যুদ্ধকৌশল
◉ তুলুঘমা (Tulughma) কৌশল
❖ তুলুঘমা ছিল অশ্বারোহী বাহিনীকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করে শত্রুবাহিনীকে চারপাশ থেকে আক্রমণ ও ঘিরে ফেলার যুদ্ধকৌশল।
❖ এতে মূল বাহিনীর পাশাপাশি দুই পার্শ্বে দ্রুতগতির অশ্বারোহী দল অবস্থান করত।
❖ শত্রুবাহিনী সামনে অগ্রসর হলে পার্শ্ববর্তী দলগুলো দ্রুত আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষের বাহিনীকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করত।
❖ এই কৌশল সংখ্যায় বড় বাহিনীর বিরুদ্ধে তুলনামূলক ছোট বাহিনীকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করত।
◉ আরাবা (Araba) কৌশল
❖ আরাবা বলতে চাকার গাড়ি বা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত গাড়িবেষ্টনীকে বোঝায়।
❖ বাবর যুদ্ধক্ষেত্রে একাধিক গাড়ি সারিবদ্ধভাবে স্থাপন করেন।
❖ গাড়িগুলো চামড়ার তৈরি রশি বা বন্ধনী দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হতো।
❖ গাড়ির আড়ালে কামান ও আগ্নেয়াস্ত্রধারী সৈন্যরা অবস্থান করত।
❖ এর ফলে শত্রুবাহিনীর সরাসরি আক্রমণ প্রতিরোধ করা এবং কামান পরিচালনা করা সহজ হতো।
◉ কামান ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার
❖ বাবরের বাহিনীতে বারুদচালিত কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়।
❖ কামানের শব্দ ও গোলাবর্ষণ ইব্রাহিম লোদির যুদ্ধহাতিগুলোর ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল বলে প্রচলিত বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
❖ তবে গবেষকদের মতে, শুধু কামান নয়; বাবরের সামরিক প্রস্তুতি, অশ্বারোহী কৌশল এবং প্রতিপক্ষের দুর্বল সমন্বয়ও বিজয়ের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
৮. ২১ এপ্রিল ১৫২৬ — প্রথম পানিপথের যুদ্ধ
❖ ২১ এপ্রিল ১৫২৬ সকালে বাবর ও ইব্রাহিম লোদির বাহিনীর মধ্যে প্রধান সংঘর্ষ শুরু হয়।
❖ ইব্রাহিম লোদির বৃহৎ বাহিনী বাবরের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়।
❖ বাবরের বাহিনী কামান, আগ্নেয়াস্ত্র ও অশ্বারোহী বাহিনীর সমন্বয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
❖ তুলুঘমা কৌশলের মাধ্যমে বাবরের অশ্বারোহী বাহিনী লোদির বাহিনীর পার্শ্ববর্তী অংশগুলোতে আক্রমণ পরিচালনা করে।
❖ ইব্রাহিম লোদির বাহিনী বিশাল হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়।
❖ সংঘর্ষের একপর্যায়ে লোদি বাহিনী পরাজিত হয় এবং ইব্রাহিম লোদি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন।
৯. প্রথম পানিপথের যুদ্ধের ফলাফল
১. লোদি বংশের পতন
❖ ইব্রাহিম লোদির মৃত্যুর মাধ্যমে দিল্লিতে লোদি রাজবংশের শাসনের অবসান ঘটে।
২. দিল্লি সালতানাতের সমাপ্তি
❖ ১২০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দিল্লি সালতানাতের স্বাধীন রাজবংশীয় শাসনের সমাপ্তি ঘটে।
৩. মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা
❖ বাবর দিল্লি ও আগ্রার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
❖ ১৫২৬ সালকে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাবর্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়।
৪. সামরিক কৌশলে পরিবর্তন
❖ সংগঠিত মাঠ কামান, আগ্নেয়াস্ত্র ও অশ্বারোহী বাহিনীর সমন্বিত প্রয়োগ উত্তর ভারতের সামরিক ইতিহাসে নতুন গুরুত্ব লাভ করে।
৫. নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা
❖ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।
❖ পরবর্তী সময়ে বাবর ও তাঁর উত্তরসূরিরা মুঘল সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করেন।
১০. প্রথম পানিপথের যুদ্ধের পর বাবরের গুরুত্বপূর্ণ অভিযান
◉ খানুয়ার যুদ্ধ — ১৬ মার্চ ১৫২৭
❖ বাবর রাজপুত নেতা রানা সাঙ্গার নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে পরাজিত করেন।
❖ যুদ্ধের স্থান — বর্তমান ভারতের রাজস্থানের ভরতপুর অঞ্চলের নিকটে।
❖ এই বিজয় উত্তর ভারতে বাবরের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
◉ চান্দেরির যুদ্ধ — ১৫২৮
❖ বাবর চান্দেরিতে রাজপুত শাসক মেদিনী রায়ের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন।
❖ বাবরের বাহিনী চান্দেরি দুর্গ দখল করে।
◉ ঘাঘরার যুদ্ধ — ১৫২৯
❖ বাবর বিহার ও পূর্ব উত্তর ভারতের আফগান প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
❖ এই বিজয় তাঁর পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করে।
১১. বাবরনামা — মুঘল ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ
❖ বাবরনামা (Baburnama) বাবরের আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিকথা।
❖ গ্রন্থটির অপর পরিচিতি তুজুক-ই-বাবরি (Tuzuk-i-Baburi)।
❖ এটি মূলত চাগতাই তুর্কি ভাষায় রচিত।
❖ গ্রন্থে বাবরের রাজনৈতিক সংগ্রাম, সামরিক অভিযান, পরিবার, প্রকৃতি, নগর, সমাজ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ রয়েছে।
❖ মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে আবদুর রহিম খান-ই-খানান গ্রন্থটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন।
❖ প্রথম পানিপথের যুদ্ধ সম্পর্কে বাবরনামা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক ঐতিহাসিক উৎস।
◈ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংশোধনী:
❖ ছবির বইয়ের ব্যাখ্যায় পানিপথকে ‘যমুনা নদীর তীরে’ বলা হয়েছে। কিন্তু পানিপথ শহর সরাসরি যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত নয়; যমুনা পানিপথ জেলার পূর্ব সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়।
❖ বইয়ে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে সর্বপ্রথম কামানের ব্যবহার হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এটি ভারতে বারুদচালিত কামানের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠিত যুদ্ধক্ষেত্রীয় ব্যবহারের অন্যতম উদাহরণ। তবে উপমহাদেশে কামানের একেবারে প্রথম ব্যবহার পানিপথেই হয়েছিল—এমন দাবি নিশ্চিত নয়।
◈ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধ — ২১ এপ্রিল ১৫২৬।
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধ সংঘটিত হয় — ষোড়শ শতাব্দীতে।
➤ যুদ্ধের স্থান — পানিপথ, হরিয়ানা, ভারত।
➤ যুদ্ধের বিজয়ী — জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।
➤ যুদ্ধের পরাজিত শাসক — ইব্রাহিম লোদি।
➤ ইব্রাহিম লোদির মৃত্যু — ২১ এপ্রিল ১৫২৬।
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় — মুঘল সাম্রাজ্য।
➤ মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা — বাবর।
➤ মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাবর্ষ — ১৫২৬।
➤ দিল্লি সালতানাতের প্রথম শাসক — কুতুবউদ্দিন আইবেক।
➤ দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠা — ১২০৬।
➤ দিল্লি সালতানাতের শেষ বংশ — লোদি বংশ।
➤ লোদি বংশের প্রতিষ্ঠাতা — বহলুল লোদি।
➤ লোদি বংশ প্রতিষ্ঠা — ১৪৫১।
➤ লোদি বংশের দ্বিতীয় শাসক — সিকান্দার লোদি।
➤ লোদি বংশের শেষ শাসক — ইব্রাহিম লোদি।
➤ ইব্রাহিম লোদির শাসনকাল — ১৫১৭–১৫২৬।
➤ ইব্রাহিম লোদির পিতা — সিকান্দার লোদি।
➤ ইব্রাহিম লোদির পিতামহ — বহলুল লোদি।
➤ বাবরের জন্ম — ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৪৮৩।
➤ বাবরের জন্মস্থান — আন্দিজান, ফারগানা।
➤ ফারগানা বর্তমানে প্রধানত — উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানজুড়ে বিস্তৃত ঐতিহাসিক অঞ্চল।
➤ বাবরের পিতা — উমর শেখ মির্জা।
➤ বাবরের মাতা — কুতলুগ নিগার খানম।
➤ বাবরের পিতৃবংশ — তিমুরীয়।
➤ বাবরের মাতৃবংশ — চেঙ্গিস খানের বংশধারা।
➤ বাবর ফারগানার শাসক হন — ১৪৯৪ সালে।
➤ বাবর কাবুল দখল করেন — ১৫০৪ সালে।
➤ বাবরের ভারত অভিযানের চূড়ান্ত পর্যায় শুরু — ১৫২৫ সালে।
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধে বাবরের বিশেষ যুদ্ধকৌশল — তুলুঘমা ও আরাবা।
➤ তুলুঘমা — অশ্বারোহী বাহিনীর পার্শ্ব আক্রমণ ও ঘেরাও কৌশল।
➤ আরাবা — গাড়িবেষ্টনীভিত্তিক প্রতিরক্ষামূলক কৌশল।
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র — কামান ও বারুদচালিত আগ্নেয়াস্ত্র।
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক উৎস — বাবরনামা।
➤ বাবরনামার রচয়িতা — বাবর।
➤ বাবরনামার মূল ভাষা — চাগতাই তুর্কি।
➤ বাবরনামার ফারসি অনুবাদক — আবদুর রহিম খান-ই-খানান।
➤ খানুয়ার যুদ্ধ — ১৬ মার্চ ১৫২৭।
➤ খানুয়ার যুদ্ধে বাবরের প্রতিপক্ষ — রানা সাঙ্গা।
➤ চান্দেরির যুদ্ধ — ১৫২৮।
➤ চান্দেরির যুদ্ধে প্রতিপক্ষ — মেদিনী রায়।
➤ ঘাঘরার যুদ্ধ — ১৫২৯।
➤ বাবরের মৃত্যু — ২৬ ডিসেম্বর ১৫৩০।
➤ বাবরের উত্তরসূরি — হুমায়ুন।"
◈ সঠিক উত্তর: ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ (২১ এপ্রিল)।
◈ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
❖ প্রথম পানিপথের যুদ্ধ (First Battle of Panipat) সংঘটিত হয় ২১ এপ্রিল ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে, ভারতের বর্তমান হরিয়ানা রাজ্যের পানিপথে।
❖ এই যুদ্ধে মধ্য এশীয় তুর্কি-মোঙ্গল বংশোদ্ভূত সম্রাট জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর দিল্লি সালতানাতের লোদি বংশের সর্বশেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করেন।
❖ যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদি নিহত হন এবং দিল্লিতে লোদি বংশের শাসনের অবসান ঘটে। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
❖ পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের বাহিনী কামান, বারুদচালিত আগ্নেয়াস্ত্র, অশ্বারোহী বাহিনীর দ্রুত আক্রমণ এবং বিশেষ যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করে। এই সম্মিলিত সামরিক কৌশল বাবরের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১. মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের জীবন ও পরিচিতি
❖ পূর্ণ নাম: জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর (Zahir-ud-din Muhammad Babur)।
❖ জন্ম: ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৪৮৩ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ জন্মস্থান: আন্দিজান, ফারগানা উপত্যকা, বর্তমান উজবেকিস্তান।
❖ মৃত্যু: ২৬ ডিসেম্বর ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ মৃত্যুস্থান: আগ্রা, ভারত।
❖ পিতা: উমর শেখ মির্জা দ্বিতীয়।
❖ মাতা: কুতলুগ নিগার খানম।
❖ রাজবংশ: তিমুরীয় বা Timurid।
❖ মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা: ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ ভারতে শাসনকাল: ১৫২৬–১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ উত্তরসূরি: সম্রাট হুমায়ুন।
❖ বিখ্যাত গ্রন্থ: বাবরনামা (Baburnama)।
❖ গ্রন্থের মূল ভাষা: চাগতাই তুর্কি (Chagatai Turkish)।
❖ বাবর ছিলেন পিতার দিক থেকে তিমুরের বংশধর এবং মাতার দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর।
২. বাবরের প্রাথমিক জীবন ও সামরিক উত্থান
◉ ১৪৯৪ সাল — ফারগানার শাসন লাভ
❖ বাবরের পিতা উমর শেখ মির্জার মৃত্যুর পর মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি ফারগানার শাসনভার গ্রহণ করেন।
❖ ফারগানা ছিল মধ্য এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল, যা বর্তমানে প্রধানত উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের মধ্যে বিস্তৃত।
◉ সমরকন্দ দখলের চেষ্টা
❖ বাবর তরুণ বয়স থেকেই সমরকন্দ দখল করার চেষ্টা করেন।
❖ তিনি কয়েকবার সমরকন্দ দখল করলেও উজবেক নেতা মুহাম্মদ শায়বানি খান এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীর কারণে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেননি।
◉ ১৫০৪ সাল — কাবুল দখল
❖ মধ্য এশিয়ায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারানোর পর বাবর আফগানিস্তানের দিকে অগ্রসর হন।
❖ ১৫০৪ সালে তিনি কাবুল দখল করেন এবং সেখানে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
❖ পরবর্তী সময়ে কাবুল তাঁর ভারত অভিযান পরিচালনার প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
৩. প্রথম পানিপথের যুদ্ধের রাজনৈতিক পটভূমি
❖ ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে উত্তর ভারতে দিল্লি সালতানাতের লোদি বংশ শাসন করছিল।
❖ লোদি রাজবংশ (Lodi Dynasty) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৪৫১ খ্রিষ্টাব্দে।
❖ এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বহলুল লোদি (Bahlul Lodi)।
❖ লোদি বংশের প্রধান শাসকেরা ছিলেন—
১. বহলুল লোদি (১৪৫১–১৪৮৯): লোদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।
২. সিকান্দার লোদি (১৪৮৯–১৫১৭): সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ শাসক; আগ্রা নগর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত।
৩. ইব্রাহিম লোদি (১৫১৭–১৫২৬): লোদি বংশের সর্বশেষ সুলতান।
❖ ইব্রাহিম লোদি কেন্দ্রীয় শাসকের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চাইলে আফগান অভিজাতদের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তুষ্ট হয়।
❖ পাঞ্জাবের গভর্নর দৌলত খান লোদি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে তাঁর বিরোধ বৃদ্ধি পায়।
❖ এই রাজনৈতিক অস্থিরতা বাবরের উত্তর ভারতে অভিযানের সুযোগ তৈরি করে।
৪. ইব্রাহিম লোদির জীবন ও পরিচিতি
❖ পূর্ণ নাম: ইব্রাহিম খান লোদি (Ibrahim Khan Lodi)।
❖ জন্ম: আনুমানিক ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ মৃত্যু: ২১ এপ্রিল ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ মৃত্যুস্থান: পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্র।
❖ পিতা: সিকান্দার লোদি।
❖ পিতামহ: বহলুল লোদি।
❖ রাজবংশ: লোদি।
❖ জাতিগত পরিচয়: আফগান বা পশতুন।
❖ শাসনকাল: ১৫১৭–১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ।
❖ রাজধানী: দিল্লি।
❖ ঐতিহাসিক পরিচিতি: দিল্লি সালতানাতের সর্বশেষ সুলতান।
❖ পরাজিত হন: বাবরের কাছে।
❖ পরাজয়ের যুদ্ধ: প্রথম পানিপথের যুদ্ধ।
৫. বাবরের ভারত অভিযানের ঘটনাপ্রবাহ
◉ ১৫২৫ সাল — চূড়ান্ত ভারত অভিযানের সূচনা
❖ বাবর কাবুল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে তাঁর চূড়ান্ত অভিযান শুরু করেন।
❖ তিনি পাঞ্জাব অঞ্চলে অগ্রসর হয়ে লাহোরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
❖ এরপর তিনি দিল্লির দিকে অগ্রসর হন।
◉ ১৫২৬ সালের এপ্রিল — পানিপথে অবস্থান
❖ বাবর পানিপথ অঞ্চলে পৌঁছে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করেন।
❖ তিনি যুদ্ধের জন্য কামান, অশ্বারোহী বাহিনী এবং প্রতিরক্ষামূলক গাড়ির সারি সাজান।
❖ তাঁর বাহিনীকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে স্থাপন করেন।
৬. দুই বাহিনীর সামরিক শক্তি
❖ বাবরের বাহিনী
✦ আনুমানিক সৈন্যসংখ্যা — ১২,০০০–১৫,০০০; ঐতিহাসিক সূত্রভেদে ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়।
✦ কামান — আনুমানিক ২০–২৪টি বলে একটি প্রচলিত হিসাব রয়েছে।
✦ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি — অশ্বারোহী বাহিনী, তিরন্দাজ, কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র।
✦ প্রধান সেনাপতি — বাবর।
❖ ইব্রাহিম লোদির বাহিনী
✦ সৈন্যসংখ্যা — বাবরের বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি।
✦ কোনো কোনো বিবরণে শিবির-অনুসারীসহ প্রায় ১,০০,০০০ জনের উল্লেখ পাওয়া যায়; প্রকৃত যোদ্ধার সংখ্যা ছিল কম।
✦ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি — পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী এবং যুদ্ধহাতি।
✦ প্রচলিত হিসাবে প্রায় ১,০০০ যুদ্ধহাতি ছিল।
✦ প্রধান সেনাপতি — ইব্রাহিম লোদি।
❖ সৈন্যসংখ্যা ও কামানের নির্দিষ্ট পরিমাণ বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে বাবরের তুলনামূলক ছোট বাহিনীর বিরুদ্ধে ইব্রাহিম লোদির বৃহৎ বাহিনী অংশ নিয়েছিল, এ বিষয়ে ঐতিহাসিক বিবরণে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে।
৭. বাবরের বিখ্যাত যুদ্ধকৌশল
◉ তুলুঘমা (Tulughma) কৌশল
❖ তুলুঘমা ছিল অশ্বারোহী বাহিনীকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করে শত্রুবাহিনীকে চারপাশ থেকে আক্রমণ ও ঘিরে ফেলার যুদ্ধকৌশল।
❖ এতে মূল বাহিনীর পাশাপাশি দুই পার্শ্বে দ্রুতগতির অশ্বারোহী দল অবস্থান করত।
❖ শত্রুবাহিনী সামনে অগ্রসর হলে পার্শ্ববর্তী দলগুলো দ্রুত আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষের বাহিনীকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করত।
❖ এই কৌশল সংখ্যায় বড় বাহিনীর বিরুদ্ধে তুলনামূলক ছোট বাহিনীকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করত।
◉ আরাবা (Araba) কৌশল
❖ আরাবা বলতে চাকার গাড়ি বা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত গাড়িবেষ্টনীকে বোঝায়।
❖ বাবর যুদ্ধক্ষেত্রে একাধিক গাড়ি সারিবদ্ধভাবে স্থাপন করেন।
❖ গাড়িগুলো চামড়ার তৈরি রশি বা বন্ধনী দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হতো।
❖ গাড়ির আড়ালে কামান ও আগ্নেয়াস্ত্রধারী সৈন্যরা অবস্থান করত।
❖ এর ফলে শত্রুবাহিনীর সরাসরি আক্রমণ প্রতিরোধ করা এবং কামান পরিচালনা করা সহজ হতো।
◉ কামান ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার
❖ বাবরের বাহিনীতে বারুদচালিত কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়।
❖ কামানের শব্দ ও গোলাবর্ষণ ইব্রাহিম লোদির যুদ্ধহাতিগুলোর ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল বলে প্রচলিত বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
❖ তবে গবেষকদের মতে, শুধু কামান নয়; বাবরের সামরিক প্রস্তুতি, অশ্বারোহী কৌশল এবং প্রতিপক্ষের দুর্বল সমন্বয়ও বিজয়ের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
৮. ২১ এপ্রিল ১৫২৬ — প্রথম পানিপথের যুদ্ধ
❖ ২১ এপ্রিল ১৫২৬ সকালে বাবর ও ইব্রাহিম লোদির বাহিনীর মধ্যে প্রধান সংঘর্ষ শুরু হয়।
❖ ইব্রাহিম লোদির বৃহৎ বাহিনী বাবরের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়।
❖ বাবরের বাহিনী কামান, আগ্নেয়াস্ত্র ও অশ্বারোহী বাহিনীর সমন্বয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
❖ তুলুঘমা কৌশলের মাধ্যমে বাবরের অশ্বারোহী বাহিনী লোদির বাহিনীর পার্শ্ববর্তী অংশগুলোতে আক্রমণ পরিচালনা করে।
❖ ইব্রাহিম লোদির বাহিনী বিশাল হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়।
❖ সংঘর্ষের একপর্যায়ে লোদি বাহিনী পরাজিত হয় এবং ইব্রাহিম লোদি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন।
৯. প্রথম পানিপথের যুদ্ধের ফলাফল
১. লোদি বংশের পতন
❖ ইব্রাহিম লোদির মৃত্যুর মাধ্যমে দিল্লিতে লোদি রাজবংশের শাসনের অবসান ঘটে।
২. দিল্লি সালতানাতের সমাপ্তি
❖ ১২০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দিল্লি সালতানাতের স্বাধীন রাজবংশীয় শাসনের সমাপ্তি ঘটে।
৩. মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা
❖ বাবর দিল্লি ও আগ্রার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
❖ ১৫২৬ সালকে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাবর্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়।
৪. সামরিক কৌশলে পরিবর্তন
❖ সংগঠিত মাঠ কামান, আগ্নেয়াস্ত্র ও অশ্বারোহী বাহিনীর সমন্বিত প্রয়োগ উত্তর ভারতের সামরিক ইতিহাসে নতুন গুরুত্ব লাভ করে।
৫. নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা
❖ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।
❖ পরবর্তী সময়ে বাবর ও তাঁর উত্তরসূরিরা মুঘল সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করেন।
১০. প্রথম পানিপথের যুদ্ধের পর বাবরের গুরুত্বপূর্ণ অভিযান
◉ খানুয়ার যুদ্ধ — ১৬ মার্চ ১৫২৭
❖ বাবর রাজপুত নেতা রানা সাঙ্গার নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে পরাজিত করেন।
❖ যুদ্ধের স্থান — বর্তমান ভারতের রাজস্থানের ভরতপুর অঞ্চলের নিকটে।
❖ এই বিজয় উত্তর ভারতে বাবরের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
◉ চান্দেরির যুদ্ধ — ১৫২৮
❖ বাবর চান্দেরিতে রাজপুত শাসক মেদিনী রায়ের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন।
❖ বাবরের বাহিনী চান্দেরি দুর্গ দখল করে।
◉ ঘাঘরার যুদ্ধ — ১৫২৯
❖ বাবর বিহার ও পূর্ব উত্তর ভারতের আফগান প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
❖ এই বিজয় তাঁর পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করে।
১১. বাবরনামা — মুঘল ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ
❖ বাবরনামা (Baburnama) বাবরের আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিকথা।
❖ গ্রন্থটির অপর পরিচিতি তুজুক-ই-বাবরি (Tuzuk-i-Baburi)।
❖ এটি মূলত চাগতাই তুর্কি ভাষায় রচিত।
❖ গ্রন্থে বাবরের রাজনৈতিক সংগ্রাম, সামরিক অভিযান, পরিবার, প্রকৃতি, নগর, সমাজ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ রয়েছে।
❖ মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে আবদুর রহিম খান-ই-খানান গ্রন্থটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন।
❖ প্রথম পানিপথের যুদ্ধ সম্পর্কে বাবরনামা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক ঐতিহাসিক উৎস।
◈ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংশোধনী:
❖ ছবির বইয়ের ব্যাখ্যায় পানিপথকে ‘যমুনা নদীর তীরে’ বলা হয়েছে। কিন্তু পানিপথ শহর সরাসরি যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত নয়; যমুনা পানিপথ জেলার পূর্ব সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়।
❖ বইয়ে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে সর্বপ্রথম কামানের ব্যবহার হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এটি ভারতে বারুদচালিত কামানের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠিত যুদ্ধক্ষেত্রীয় ব্যবহারের অন্যতম উদাহরণ। তবে উপমহাদেশে কামানের একেবারে প্রথম ব্যবহার পানিপথেই হয়েছিল—এমন দাবি নিশ্চিত নয়।
◈ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধ — ২১ এপ্রিল ১৫২৬।
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধ সংঘটিত হয় — ষোড়শ শতাব্দীতে।
➤ যুদ্ধের স্থান — পানিপথ, হরিয়ানা, ভারত।
➤ যুদ্ধের বিজয়ী — জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।
➤ যুদ্ধের পরাজিত শাসক — ইব্রাহিম লোদি।
➤ ইব্রাহিম লোদির মৃত্যু — ২১ এপ্রিল ১৫২৬।
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় — মুঘল সাম্রাজ্য।
➤ মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা — বাবর।
➤ মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাবর্ষ — ১৫২৬।
➤ দিল্লি সালতানাতের প্রথম শাসক — কুতুবউদ্দিন আইবেক।
➤ দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠা — ১২০৬।
➤ দিল্লি সালতানাতের শেষ বংশ — লোদি বংশ।
➤ লোদি বংশের প্রতিষ্ঠাতা — বহলুল লোদি।
➤ লোদি বংশ প্রতিষ্ঠা — ১৪৫১।
➤ লোদি বংশের দ্বিতীয় শাসক — সিকান্দার লোদি।
➤ লোদি বংশের শেষ শাসক — ইব্রাহিম লোদি।
➤ ইব্রাহিম লোদির শাসনকাল — ১৫১৭–১৫২৬।
➤ ইব্রাহিম লোদির পিতা — সিকান্দার লোদি।
➤ ইব্রাহিম লোদির পিতামহ — বহলুল লোদি।
➤ বাবরের জন্ম — ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৪৮৩।
➤ বাবরের জন্মস্থান — আন্দিজান, ফারগানা।
➤ ফারগানা বর্তমানে প্রধানত — উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানজুড়ে বিস্তৃত ঐতিহাসিক অঞ্চল।
➤ বাবরের পিতা — উমর শেখ মির্জা।
➤ বাবরের মাতা — কুতলুগ নিগার খানম।
➤ বাবরের পিতৃবংশ — তিমুরীয়।
➤ বাবরের মাতৃবংশ — চেঙ্গিস খানের বংশধারা।
➤ বাবর ফারগানার শাসক হন — ১৪৯৪ সালে।
➤ বাবর কাবুল দখল করেন — ১৫০৪ সালে।
➤ বাবরের ভারত অভিযানের চূড়ান্ত পর্যায় শুরু — ১৫২৫ সালে।
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধে বাবরের বিশেষ যুদ্ধকৌশল — তুলুঘমা ও আরাবা।
➤ তুলুঘমা — অশ্বারোহী বাহিনীর পার্শ্ব আক্রমণ ও ঘেরাও কৌশল।
➤ আরাবা — গাড়িবেষ্টনীভিত্তিক প্রতিরক্ষামূলক কৌশল।
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র — কামান ও বারুদচালিত আগ্নেয়াস্ত্র।
➤ প্রথম পানিপথের যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক উৎস — বাবরনামা।
➤ বাবরনামার রচয়িতা — বাবর।
➤ বাবরনামার মূল ভাষা — চাগতাই তুর্কি।
➤ বাবরনামার ফারসি অনুবাদক — আবদুর রহিম খান-ই-খানান।
➤ খানুয়ার যুদ্ধ — ১৬ মার্চ ১৫২৭।
➤ খানুয়ার যুদ্ধে বাবরের প্রতিপক্ষ — রানা সাঙ্গা।
➤ চান্দেরির যুদ্ধ — ১৫২৮।
➤ চান্দেরির যুদ্ধে প্রতিপক্ষ — মেদিনী রায়।
➤ ঘাঘরার যুদ্ধ — ১৫২৯।
➤ বাবরের মৃত্যু — ২৬ ডিসেম্বর ১৫৩০।
➤ বাবরের উত্তরসূরি — হুমায়ুন।"