01
🎯 Level 1
০১. কত সালে ইউরোপ হতে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে সমুদ্রপথে পূর্বদিকে আসার জলপথ আবিষ্কার হয়? (প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক: ১০)
✅ সঠিক উত্তর:ক. ১৪৮৭
ব্যাখ্যা:
"উত্তর: ক
◈ সঠিক উত্তর: ১৪৮৭ সাল
◈ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
❖ পর্তুগিজ নাবিক বার্থোলোমিউ ডিয়াজ (Bartolomeu Dias) ১৪৮৭ সালে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের উদ্দেশ্যে সমুদ্র অভিযান শুরু করেন। এই অভিযানের মাধ্যমে ইউরোপীয় নাবিকেরা আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগরের দিকে যাত্রার সম্ভাব্য জলপথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা লাভ করেন।
❖ ১৪৮৭ সালে ডিয়াজ অভিযান শুরু করলেও আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত সফলভাবে অতিক্রম করার ঘটনাটি ঘটে ১৪৮৮ সালে। তাই প্রশ্নের প্রচলিত উত্তর ১৪৮৭ হলেও ঐতিহাসিকভাবে ১৪৮৭–১৪৮৮ সালের অভিযান উল্লেখ করাই অধিক নির্ভুল।
❖ ডিয়াজের অভিযানের ফলে ইউরোপ থেকে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল অনুসরণ করে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে, আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত অতিক্রম করে পূর্বদিকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের পথের সম্ভাবনা প্রমাণিত হয়।
❖ পরবর্তী সময়ে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা (Vasco da Gama) এই পথ অনুসরণ করে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ১৪৯৮ সালে ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছান।
❖ ছবির বইয়ের ব্যাখ্যায় ভাস্কো-দা-গামার কালিকটে পৌঁছানোর তারিখ ২৭ মে ১৪৯৮ উল্লেখ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে বহুল স্বীকৃত ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর কালিকটে পৌঁছানোর তারিখ সাধারণত ২০ মে ১৪৯৮ হিসেবে দেওয়া হয়।
❖ বার্থোলোমিউ ডিয়াজ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের সমুদ্রপথ উন্মোচন করেন এবং ভাস্কো-দা-গামা সেই পথ ব্যবহার করে ইউরোপ থেকে সরাসরি সমুদ্রযাত্রায় ভারতে পৌঁছান। এই দুই অভিযানের উদ্দেশ্য ও ঐতিহাসিক অবদান পৃথক।
◉ ১. ইউরোপ থেকে ভারতে সমুদ্রপথ অনুসন্ধানের পটভূমি
❖ মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলো এশিয়ার মসলা, রেশম, সুতি বস্ত্র, মূল্যবান পাথর এবং অন্যান্য বিলাসপণ্যের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট ছিল।
❖ ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গোলমরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল ও অন্যান্য মসলা ইউরোপীয় বাজারে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল।
❖ এসব পণ্য স্থলপথ এবং ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যপথে ইউরোপে পৌঁছাত।
❖ আরব, পারস্য ও অন্যান্য এশীয় বণিকেরা ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
❖ ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যে ভেনিস ও জেনোয়ার বণিকদের প্রভাব ছিল।
❖ ইউরোপীয় রাজশক্তিগুলো এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য স্থাপন করে মধ্যবর্তী বণিকদের ওপর নির্ভরতা কমাতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
❖ ফলে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর নতুন সমুদ্রপথ অনুসন্ধান পর্তুগিজ অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
◉ ২. সমুদ্রপথ অনুসন্ধানে পর্তুগালের ভূমিকা
❖ পর্তুগাল (Portugal) পশ্চিম ইউরোপের আইবেরীয় উপদ্বীপে অবস্থিত একটি দেশ।
❖ আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী অবস্থান পর্তুগালের সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সুবিধা সৃষ্টি করে।
❖ প্রিন্স হেনরি দ্য নেভিগেটর (Prince Henry the Navigator, ১৩৯৪–১৪৬০) পর্তুগিজ সামুদ্রিক অনুসন্ধানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
❖ তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল অনুসন্ধান, নৌচালনা ও সমুদ্রযাত্রাসংক্রান্ত জ্ঞানের বিকাশ ঘটে।
❖ পর্তুগিজ নাবিকেরা কম্পাস, অ্যাস্ট্রোল্যাব, নৌমানচিত্র এবং ক্যারাভেল (Caravel) ধরনের জাহাজ ব্যবহার করে সমুদ্র অভিযানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেন।
❖ রাজা দ্বিতীয় জোয়াও (John II)-এর শাসনামলে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত সমুদ্রপথ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে।
❖ তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় বার্থোলোমিউ ডিয়াজ দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল অনুসন্ধানে যাত্রা করেন।
◉ ৩. বার্থোলোমিউ ডিয়াজের অভিযান
❖ বার্থোলোমিউ ডিয়াজ ছিলেন পঞ্চদশ শতকের একজন বিখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক ও সমুদ্র অভিযাত্রী।
❖ তিনি ১৪৮৭ সালে লিসবন থেকে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
❖ অভিযানে তিনি আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন।
❖ দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে ভয়াবহ ঝড়ের কারণে তাঁর নৌবহর উপকূল থেকে অনেক দূরে সরে যায়।
❖ ঝড়ের পর তিনি পূর্ব ও উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত অতিক্রম করার বিষয়টি উপলব্ধি করেন।
❖ ১৪৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকার মসেল বে (Mossel Bay) অঞ্চলে পৌঁছান।
❖ এই অভিযান প্রমাণ করে, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগরের দিকে সমুদ্রপথে প্রবেশ সম্ভব।
❖ তবে ডিয়াজ নিজে ভারতে পৌঁছাননি। তাঁর অভিযান ভবিষ্যতের ভারতগামী সমুদ্রযাত্রার ভিত্তি স্থাপন করে।
◉ ৪. উত্তমাশা অন্তরীপের নামকরণের ইতিহাস
❖ আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের বিখ্যাত অন্তরীপটির নাম উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope)।
❖ ডিয়াজ তাঁর অভিযানে ভয়াবহ ঝড়ের সম্মুখীন হওয়ার কারণে অন্তরীপটির সঙ্গে Cape of Storms বা ঝড়ের অন্তরীপ নামের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।
❖ পরবর্তীকালে পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জোয়াও এর নাম Cape of Good Hope রাখেন বলে প্রচলিত ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
❖ উত্তমাশা অন্তরীপ নামকরণের পেছনে প্রধান ধারণা ছিল, এই পথ দিয়ে অগ্রসর হলে এশিয়া ও ভারতের সঙ্গে সরাসরি সামুদ্রিক বাণিজ্য স্থাপন সম্ভব হতে পারে।
❖ উত্তমাশা অন্তরীপ বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ উপদ্বীপে অবস্থিত।
❖ গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পার্থক্য হলো, উত্তমাশা অন্তরীপ আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণ বিন্দু নয়। আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণ বিন্দু হলো কেপ আগুলহাস (Cape Agulhas)।
◉ ৫. ডিয়াজের আবিষ্কার থেকে ভাস্কো-দা-গামার ভারত অভিযান
❖ ডিয়াজের অভিযানের প্রায় এক দশক পরে ভাস্কো-দা-গামা ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে নতুন সমুদ্র অভিযান পরিচালনা করেন।
❖ ৮ জুলাই ১৪৯৭ সালে ভাস্কো-দা-গামা পর্তুগালের লিসবন থেকে যাত্রা শুরু করেন।
❖ তিনি আটলান্টিক মহাসাগর অতিক্রম করে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হন।
❖ ১৪৯৭ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর নৌবহর উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম করে।
❖ পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের মোজাম্বিক, মোম্বাসা ও মালিন্দি অঞ্চলে যাত্রাবিরতি করেন।
❖ মালিন্দি থেকে তিনি একজন অভিজ্ঞ নৌপথপ্রদর্শকের সহায়তায় ভারত মহাসাগর অতিক্রম করেন।
❖ ২০ মে ১৪৯৮ সালে তিনি ভারতের মালাবার উপকূলের কালিকট বন্দরে পৌঁছান বলে বহুল প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
❖ এই অভিযানের মাধ্যমে ইউরোপ থেকে আফ্রিকা ঘুরে ভারতে সরাসরি সমুদ্রপথে যাতায়াতের কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
◉ ৬. সমুদ্রপথ আবিষ্কারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব
❖ নতুন সমুদ্রপথের ফলে পর্তুগাল ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সরাসরি সামুদ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ লাভ করে।
❖ ভারত মহাসাগরের মসলা বাণিজ্যে পর্তুগিজদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।
❖ পর্তুগিজরা ভারতীয় উপকূলে বাণিজ্যকেন্দ্র, নৌঘাঁটি ও দুর্গ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করে।
❖ পরবর্তী সময়ে গোয়া, কোচিন, দিউ, দমন ও মালাক্কা অঞ্চলে পর্তুগিজ প্রভাব বিস্তৃত হয়।
❖ ১৫১০ সালে গোয়া দখল এবং ১৫১১ সালে মালাক্কা দখল পর্তুগিজ সামুদ্রিক সাম্রাজ্য বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
❖ পর্তুগিজদের অনুসরণ করে ডাচ, ইংরেজ ও ফরাসি বণিকেরা ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
❖ এই ঘটনাগুলো ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক ও পরবর্তী ঔপনিবেশিক শক্তির উত্থানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
◈ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন
➤ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত অনুসন্ধানে ডিয়াজের অভিযান শুরু — ১৪৮৭ সাল।
➤ উত্তমাশা অন্তরীপ সফলভাবে অতিক্রম করেন — বার্থোলোমিউ ডিয়াজ।
➤ উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রমের ঐতিহাসিক সাল — ১৪৮৮।
➤ ডিয়াজের দেশ — পর্তুগাল।
➤ ডিয়াজের অভিযানের পৃষ্ঠপোষক — দ্বিতীয় জোয়াও।
➤ উত্তমাশা অন্তরীপের ইংরেজি নাম — Cape of Good Hope।
➤ উত্তমাশা অন্তরীপের অবস্থান — দক্ষিণ আফ্রিকা।
➤ উত্তমাশা অন্তরীপের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাচীন নাম — Cape of Storms।
➤ আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণ বিন্দু — কেপ আগুলহাস।
➤ পর্তুগিজ সামুদ্রিক অনুসন্ধানের বিখ্যাত পৃষ্ঠপোষক — প্রিন্স হেনরি দ্য নেভিগেটর।
➤ প্রিন্স হেনরি দ্য নেভিগেটরের জীবনকাল — ১৩৯৪–১৪৬০।
➤ আফ্রিকা ঘুরে ইউরোপ থেকে ভারতে সমুদ্রযাত্রা সম্পন্ন করেন — ভাস্কো-দা-গামা।
➤ ভাস্কো-দা-গামার ভারত অভিযানের সূচনা — ১৪৯৭ সাল।
➤ ভারতে ভাস্কো-দা-গামার আগমন — ১৪৯৮ সাল।
➤ ভারতে ভাস্কো-দা-গামার আগমনের বহুল প্রচলিত তারিখ — ২০ মে ১৪৯৮।
➤ ভাস্কো-দা-গামার প্রথম ভারতীয় গন্তব্য — কালিকট।
➤ কালিকটের বর্তমান নাম — কোঝিকোড় (Kozhikode)।
➤ কালিকট অবস্থিত — কেরালা, ভারত।
➤ ভারত মহাসাগরে প্রথম ইউরোপীয় সামুদ্রিক ঔপনিবেশিক শক্তি — পর্তুগিজ।
➤ পর্তুগিজদের গুরুত্বপূর্ণ নৌবিজয় — দিউয়ের যুদ্ধ, ১৫০৯ সাল।
➤ গোয়া দখল করেন — আফনসো দ্য আলবুকার্ক।
➤ গোয়া দখল — ১৫১০ সাল।
➤ মালাক্কা দখল — ১৫১১ সাল।"
◈ সঠিক উত্তর: ১৪৮৭ সাল
◈ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
❖ পর্তুগিজ নাবিক বার্থোলোমিউ ডিয়াজ (Bartolomeu Dias) ১৪৮৭ সালে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের উদ্দেশ্যে সমুদ্র অভিযান শুরু করেন। এই অভিযানের মাধ্যমে ইউরোপীয় নাবিকেরা আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগরের দিকে যাত্রার সম্ভাব্য জলপথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা লাভ করেন।
❖ ১৪৮৭ সালে ডিয়াজ অভিযান শুরু করলেও আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত সফলভাবে অতিক্রম করার ঘটনাটি ঘটে ১৪৮৮ সালে। তাই প্রশ্নের প্রচলিত উত্তর ১৪৮৭ হলেও ঐতিহাসিকভাবে ১৪৮৭–১৪৮৮ সালের অভিযান উল্লেখ করাই অধিক নির্ভুল।
❖ ডিয়াজের অভিযানের ফলে ইউরোপ থেকে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল অনুসরণ করে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে, আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত অতিক্রম করে পূর্বদিকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের পথের সম্ভাবনা প্রমাণিত হয়।
❖ পরবর্তী সময়ে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা (Vasco da Gama) এই পথ অনুসরণ করে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ১৪৯৮ সালে ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছান।
❖ ছবির বইয়ের ব্যাখ্যায় ভাস্কো-দা-গামার কালিকটে পৌঁছানোর তারিখ ২৭ মে ১৪৯৮ উল্লেখ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে বহুল স্বীকৃত ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর কালিকটে পৌঁছানোর তারিখ সাধারণত ২০ মে ১৪৯৮ হিসেবে দেওয়া হয়।
❖ বার্থোলোমিউ ডিয়াজ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের সমুদ্রপথ উন্মোচন করেন এবং ভাস্কো-দা-গামা সেই পথ ব্যবহার করে ইউরোপ থেকে সরাসরি সমুদ্রযাত্রায় ভারতে পৌঁছান। এই দুই অভিযানের উদ্দেশ্য ও ঐতিহাসিক অবদান পৃথক।
◉ ১. ইউরোপ থেকে ভারতে সমুদ্রপথ অনুসন্ধানের পটভূমি
❖ মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলো এশিয়ার মসলা, রেশম, সুতি বস্ত্র, মূল্যবান পাথর এবং অন্যান্য বিলাসপণ্যের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট ছিল।
❖ ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গোলমরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল ও অন্যান্য মসলা ইউরোপীয় বাজারে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল।
❖ এসব পণ্য স্থলপথ এবং ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যপথে ইউরোপে পৌঁছাত।
❖ আরব, পারস্য ও অন্যান্য এশীয় বণিকেরা ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
❖ ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যে ভেনিস ও জেনোয়ার বণিকদের প্রভাব ছিল।
❖ ইউরোপীয় রাজশক্তিগুলো এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য স্থাপন করে মধ্যবর্তী বণিকদের ওপর নির্ভরতা কমাতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
❖ ফলে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর নতুন সমুদ্রপথ অনুসন্ধান পর্তুগিজ অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
◉ ২. সমুদ্রপথ অনুসন্ধানে পর্তুগালের ভূমিকা
❖ পর্তুগাল (Portugal) পশ্চিম ইউরোপের আইবেরীয় উপদ্বীপে অবস্থিত একটি দেশ।
❖ আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী অবস্থান পর্তুগালের সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সুবিধা সৃষ্টি করে।
❖ প্রিন্স হেনরি দ্য নেভিগেটর (Prince Henry the Navigator, ১৩৯৪–১৪৬০) পর্তুগিজ সামুদ্রিক অনুসন্ধানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
❖ তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল অনুসন্ধান, নৌচালনা ও সমুদ্রযাত্রাসংক্রান্ত জ্ঞানের বিকাশ ঘটে।
❖ পর্তুগিজ নাবিকেরা কম্পাস, অ্যাস্ট্রোল্যাব, নৌমানচিত্র এবং ক্যারাভেল (Caravel) ধরনের জাহাজ ব্যবহার করে সমুদ্র অভিযানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেন।
❖ রাজা দ্বিতীয় জোয়াও (John II)-এর শাসনামলে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত সমুদ্রপথ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে।
❖ তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় বার্থোলোমিউ ডিয়াজ দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল অনুসন্ধানে যাত্রা করেন।
◉ ৩. বার্থোলোমিউ ডিয়াজের অভিযান
❖ বার্থোলোমিউ ডিয়াজ ছিলেন পঞ্চদশ শতকের একজন বিখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক ও সমুদ্র অভিযাত্রী।
❖ তিনি ১৪৮৭ সালে লিসবন থেকে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
❖ অভিযানে তিনি আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন।
❖ দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে ভয়াবহ ঝড়ের কারণে তাঁর নৌবহর উপকূল থেকে অনেক দূরে সরে যায়।
❖ ঝড়ের পর তিনি পূর্ব ও উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত অতিক্রম করার বিষয়টি উপলব্ধি করেন।
❖ ১৪৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকার মসেল বে (Mossel Bay) অঞ্চলে পৌঁছান।
❖ এই অভিযান প্রমাণ করে, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগরের দিকে সমুদ্রপথে প্রবেশ সম্ভব।
❖ তবে ডিয়াজ নিজে ভারতে পৌঁছাননি। তাঁর অভিযান ভবিষ্যতের ভারতগামী সমুদ্রযাত্রার ভিত্তি স্থাপন করে।
◉ ৪. উত্তমাশা অন্তরীপের নামকরণের ইতিহাস
❖ আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের বিখ্যাত অন্তরীপটির নাম উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope)।
❖ ডিয়াজ তাঁর অভিযানে ভয়াবহ ঝড়ের সম্মুখীন হওয়ার কারণে অন্তরীপটির সঙ্গে Cape of Storms বা ঝড়ের অন্তরীপ নামের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।
❖ পরবর্তীকালে পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জোয়াও এর নাম Cape of Good Hope রাখেন বলে প্রচলিত ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
❖ উত্তমাশা অন্তরীপ নামকরণের পেছনে প্রধান ধারণা ছিল, এই পথ দিয়ে অগ্রসর হলে এশিয়া ও ভারতের সঙ্গে সরাসরি সামুদ্রিক বাণিজ্য স্থাপন সম্ভব হতে পারে।
❖ উত্তমাশা অন্তরীপ বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ উপদ্বীপে অবস্থিত।
❖ গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পার্থক্য হলো, উত্তমাশা অন্তরীপ আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণ বিন্দু নয়। আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণ বিন্দু হলো কেপ আগুলহাস (Cape Agulhas)।
◉ ৫. ডিয়াজের আবিষ্কার থেকে ভাস্কো-দা-গামার ভারত অভিযান
❖ ডিয়াজের অভিযানের প্রায় এক দশক পরে ভাস্কো-দা-গামা ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে নতুন সমুদ্র অভিযান পরিচালনা করেন।
❖ ৮ জুলাই ১৪৯৭ সালে ভাস্কো-দা-গামা পর্তুগালের লিসবন থেকে যাত্রা শুরু করেন।
❖ তিনি আটলান্টিক মহাসাগর অতিক্রম করে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হন।
❖ ১৪৯৭ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর নৌবহর উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম করে।
❖ পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের মোজাম্বিক, মোম্বাসা ও মালিন্দি অঞ্চলে যাত্রাবিরতি করেন।
❖ মালিন্দি থেকে তিনি একজন অভিজ্ঞ নৌপথপ্রদর্শকের সহায়তায় ভারত মহাসাগর অতিক্রম করেন।
❖ ২০ মে ১৪৯৮ সালে তিনি ভারতের মালাবার উপকূলের কালিকট বন্দরে পৌঁছান বলে বহুল প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
❖ এই অভিযানের মাধ্যমে ইউরোপ থেকে আফ্রিকা ঘুরে ভারতে সরাসরি সমুদ্রপথে যাতায়াতের কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
◉ ৬. সমুদ্রপথ আবিষ্কারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব
❖ নতুন সমুদ্রপথের ফলে পর্তুগাল ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সরাসরি সামুদ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ লাভ করে।
❖ ভারত মহাসাগরের মসলা বাণিজ্যে পর্তুগিজদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।
❖ পর্তুগিজরা ভারতীয় উপকূলে বাণিজ্যকেন্দ্র, নৌঘাঁটি ও দুর্গ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করে।
❖ পরবর্তী সময়ে গোয়া, কোচিন, দিউ, দমন ও মালাক্কা অঞ্চলে পর্তুগিজ প্রভাব বিস্তৃত হয়।
❖ ১৫১০ সালে গোয়া দখল এবং ১৫১১ সালে মালাক্কা দখল পর্তুগিজ সামুদ্রিক সাম্রাজ্য বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
❖ পর্তুগিজদের অনুসরণ করে ডাচ, ইংরেজ ও ফরাসি বণিকেরা ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
❖ এই ঘটনাগুলো ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক ও পরবর্তী ঔপনিবেশিক শক্তির উত্থানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
◈ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন
➤ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত অনুসন্ধানে ডিয়াজের অভিযান শুরু — ১৪৮৭ সাল।
➤ উত্তমাশা অন্তরীপ সফলভাবে অতিক্রম করেন — বার্থোলোমিউ ডিয়াজ।
➤ উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রমের ঐতিহাসিক সাল — ১৪৮৮।
➤ ডিয়াজের দেশ — পর্তুগাল।
➤ ডিয়াজের অভিযানের পৃষ্ঠপোষক — দ্বিতীয় জোয়াও।
➤ উত্তমাশা অন্তরীপের ইংরেজি নাম — Cape of Good Hope।
➤ উত্তমাশা অন্তরীপের অবস্থান — দক্ষিণ আফ্রিকা।
➤ উত্তমাশা অন্তরীপের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাচীন নাম — Cape of Storms।
➤ আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণ বিন্দু — কেপ আগুলহাস।
➤ পর্তুগিজ সামুদ্রিক অনুসন্ধানের বিখ্যাত পৃষ্ঠপোষক — প্রিন্স হেনরি দ্য নেভিগেটর।
➤ প্রিন্স হেনরি দ্য নেভিগেটরের জীবনকাল — ১৩৯৪–১৪৬০।
➤ আফ্রিকা ঘুরে ইউরোপ থেকে ভারতে সমুদ্রযাত্রা সম্পন্ন করেন — ভাস্কো-দা-গামা।
➤ ভাস্কো-দা-গামার ভারত অভিযানের সূচনা — ১৪৯৭ সাল।
➤ ভারতে ভাস্কো-দা-গামার আগমন — ১৪৯৮ সাল।
➤ ভারতে ভাস্কো-দা-গামার আগমনের বহুল প্রচলিত তারিখ — ২০ মে ১৪৯৮।
➤ ভাস্কো-দা-গামার প্রথম ভারতীয় গন্তব্য — কালিকট।
➤ কালিকটের বর্তমান নাম — কোঝিকোড় (Kozhikode)।
➤ কালিকট অবস্থিত — কেরালা, ভারত।
➤ ভারত মহাসাগরে প্রথম ইউরোপীয় সামুদ্রিক ঔপনিবেশিক শক্তি — পর্তুগিজ।
➤ পর্তুগিজদের গুরুত্বপূর্ণ নৌবিজয় — দিউয়ের যুদ্ধ, ১৫০৯ সাল।
➤ গোয়া দখল করেন — আফনসো দ্য আলবুকার্ক।
➤ গোয়া দখল — ১৫১০ সাল।
➤ মালাক্কা দখল — ১৫১১ সাল।"