01
🎯 Level 1
০১. ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রথম বিদ্রোহের নাম কী? (শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষক: ২১)
✅ সঠিক উত্তর:ঘ. ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ
ব্যাখ্যা:
"উত্তর: ঘ
◈ সঠিক উত্তর: ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (Fakir-Sannyasi Rebellion)।
◈ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
❖ ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল বাংলায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রথম দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন। এ আন্দোলনে মুসলিম সুফি ফকির, হিন্দু সন্ন্যাসী, কৃষক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ অংশগ্রহণ করে।
❖ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরবর্তী সময়ে কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া সুবিধা, রাজস্বনীতি এবং ধর্মীয় ভিক্ষুজীবী সম্প্রদায়ের চলাচল ও দান সংগ্রহে বিধিনিষেধের কারণে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
❖ ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন আনুমানিক ১৭৬০ সালে শুরু হয় এবং অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত প্রবলভাবে চলতে থাকে। সাধারণ জ্ঞান ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বইয়ে এর সময়কাল ১৭৬০–১৮০০ সাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মজনু শাহের মৃত্যুর পরও বিভিন্ন নেতার অধীনে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ ১৮১২ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
❖ এ আন্দোলনের প্রধান সংগঠক ও নেতা ছিলেন ফকির মজনু শাহ (Majnu Shah)। তিনি সুফি মাদারিয়া তরিকার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন এবং বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইংরেজ কোম্পানির বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠিত করেন।
❖ তাঁর নেতৃত্বে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও ঢাকাসহ উত্তর ও পূর্ব বাংলার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। এছাড়া বিহার, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, পূর্ণিয়া, মালদহ ও অন্যান্য অঞ্চলেও বিদ্রোহীদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
❖ আন্দোলনকারীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি, রাজস্ব অফিস, কোম্পানির অনুগত জমিদারদের কাচারি এবং রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের প্রতিষ্ঠান।
❖ ১৭৬৩ সালে ফকির-সন্ন্যাসীরা ঢাকার ইংরেজ বাণিজ্যকুঠি দখল করেন। ওই বছর বাকেরগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলেও কোম্পানির প্রতিষ্ঠানে আক্রমণের ঘটনা ঘটে।
❖ ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুধু ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না; অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক আধিপত্য, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অসন্তোষ একে বৃহত্তর প্রতিরোধ আন্দোলনে পরিণত করে।
◉ ১. ফকির ও সন্ন্যাসীদের পরিচয়
❖ ফকির (Fakir/Faqir) বলতে এখানে প্রধানত মুসলিম সুফি সাধক ও ধর্মীয় ভিক্ষুজীবী সম্প্রদায়ের সদস্যদের বোঝানো হয়েছে।
❖ বাংলায় ফকিরদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাদারিয়া সুফি তরিকা (Madariya Sufi Order)-র অনুসারী ছিলেন।
❖ মাদারিয়া তরিকা দক্ষিণ এশিয়ার সুফি ধারার একটি ঐতিহাসিক সম্প্রদায়।
❖ সন্ন্যাসী (Sannyasi) বলতে হিন্দু ধর্মীয় ত্যাগী, যোগী ও ভিক্ষুজীবী সাধকদের বোঝানো হয়।
❖ এ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসীদের মধ্যে গিরি ও পুরী সম্প্রদায়ের সদস্যদের উল্লেখ পাওয়া যায়।
❖ ফকির ও সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান, তীর্থকেন্দ্র, আখড়া ও খানকাহের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন।
❖ তাঁরা গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় জমিদারদের কাছ থেকে প্রচলিত নিয়মে দান গ্রহণ করতেন।
❖ অনেক দল সশস্ত্র অবস্থায় যাতায়াত করত এবং নিজেদের সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য অস্ত্র বহন করত।
❖ কোম্পানি প্রশাসনের নতুন বিধিনিষেধ তাঁদের প্রচলিত জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে।
◉ ২. ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান কারণ
❖ রাজনৈতিক কারণ: পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্ব বিস্তার।
❖ অর্থনৈতিক কারণ: কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা, রাজস্বনীতি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ।
❖ ভূমিরাজস্ব সমস্যা: কৃষকদের ওপর রাজস্ব সংগ্রহের কঠোরতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন।
❖ ধর্মীয় ও সামাজিক কারণ: ফকির ও সন্ন্যাসীদের প্রচলিত ভিক্ষা ও দান সংগ্রহে কোম্পানির বিধিনিষেধ।
❖ চলাচলে বাধা: ভিক্ষুজীবী ও তীর্থযাত্রী গোষ্ঠীর স্বাধীন যাতায়াতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ।
❖ জমিদারদের ভূমিকা: কোম্পানির অনুগত কিছু জমিদার ও রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্থানীয় অসন্তোষ।
❖ খাদ্যসংকট: ১৭৬৯–১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কারণে কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দুর্দশা বৃদ্ধি।
❖ রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন: কোম্পানির নতুন শাসনব্যবস্থা প্রচলিত স্থানীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট করে।
❖ এসব কারণের সমন্বয়ে বাংলায় ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে বিকশিত হয়।
◉ ৩. বিদ্রোহের প্রাথমিক ঘটনাপ্রবাহ
❖ ১৭৫৭ সাল: পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়।
❖ ১৭৬০ সাল: বাংলায় ফকির-সন্ন্যাসী প্রতিরোধের প্রাথমিক পর্যায়ের সূচনা।
❖ ১৭৬৩ সাল: আন্দোলন আরও সংগঠিত ও সশস্ত্র রূপ লাভ করে।
❖ ১৭৬৩ সালে বাকেরগঞ্জে বিদ্রোহীরা কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি আক্রমণ করে।
❖ তাঁরা কুঠির কর্মকর্তা মি. ক্যালীকে কয়েক দিন আটক রাখেন এবং বাণিজ্যকুঠিতে লুণ্ঠন চালান।
❖ একই বছর ঢাকার ইংরেজ বাণিজ্যকুঠি বিদ্রোহীদের দখলে যায়।
❖ ঢাকার ইংরেজ কর্মকর্তা র্যালফ লেস্টার (Ralph Lester) পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
❖ পরে ক্যাপ্টেন গ্র্যান্ট কোম্পানির পক্ষে ঢাকার কুঠি পুনর্দখল করেন।
❖ ১৭৬৩ সালে রাজশাহীর রামপুর বোয়ালিয়ায় কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি আক্রমণ করা হয়।
❖ এসব আক্রমণের মাধ্যমে বিদ্রোহীরা কোম্পানির বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়।
◉ ৪. উত্তরবঙ্গে আন্দোলনের বিস্তার
❖ ১৭৬৭ সালের দিকে রংপুর, রাজশাহী, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি ও কুমিল্লা অঞ্চলে বিদ্রোহীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়।
❖ কোম্পানি আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাবাহিনী প্রেরণ করে।
❖ ক্যাপ্টেন ডি. ম্যাকেঞ্জি-র নেতৃত্বে রংপুর অঞ্চলে কোম্পানির বাহিনী পাঠানো হয়।
❖ অন্য একটি সংঘর্ষে কোম্পানির পক্ষে প্রেরিত বাহিনীর কর্মকর্তা মার্টল নিহত হন।
❖ ১৭৬৮–১৭৭০ সালে বিহারের শরণ ও পূর্ণিয়া, উত্তরবঙ্গের রংপুর ও দিনাজপুর এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিদ্রোহীদের আক্রমণ অব্যাহত থাকে।
❖ ১৭৭১ সালে ঘোড়াঘাট ও গোবিন্দগঞ্জ অঞ্চলে কোম্পানি বাহিনীর সঙ্গে ফকির-সন্ন্যাসীদের সংঘর্ষ ঘটে।
❖ ১৭৭২ সালে মজনু শাহ রংপুর, রাজশাহী ও বগুড়ার বিভিন্ন কোম্পানি প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ চালান।
❖ এক পর্যায়ে বিদ্রোহীরা রাজশাহীর রাজস্ব অফিস সাময়িকভাবে দখল করেন।
❖ কোম্পানির রাজস্ব সংগ্রহে বাধা দেওয়া আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে ওঠে।
◉ ৫. মজনু শাহের নেতৃত্বে আন্দোলন
❖ মজনু শাহ ছিলেন ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান সংগঠক।
❖ তিনি সুফি মাদারিয়া তরিকার অনুসারী ও নেতা ছিলেন।
❖ তাঁর অধীনে বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক সশস্ত্র দল সংগঠিত হয়।
❖ মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ, পরাগল শাহ, সোবহান শাহ ও করিম শাহ তাঁর সহযোগী বা উত্তরসূরি নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
❖ মজনু শাহ উত্তরবঙ্গ ও পূর্ববাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত চলাচল করে বিদ্রোহীদের সংগঠিত করতেন।
❖ মহাস্থানগড় ও বগুড়া অঞ্চল তাঁর সামরিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর অন্যতম ছিল।
❖ গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের খাদ্য, আশ্রয় ও তথ্য সরবরাহ করত।
❖ কোম্পানির সেনাবাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে আগাম সংবাদ সংগ্রহে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
◉ ৬. ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের প্রভাব
❖ ১৭৬৯–১৭৭০ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়।
❖ বাংলা সন ১১৭৬-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় এটি ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।
❖ অনাবৃষ্টি, ফসলহানি, খাদ্য সরবরাহের সংকট এবং রাজস্বসংক্রান্ত চাপ দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা বৃদ্ধি করে।
❖ কৃষক, শ্রমজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
❖ গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
❖ ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন দুর্ভিক্ষের আগেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভিক্ষ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অসন্তোষকে আরও তীব্র করে।
❖ বহু দরিদ্র কৃষক ও স্থানীয় মানুষ বিদ্রোহীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।
❖ ফলে দুর্ভিক্ষ আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি হিসেবে বিবেচিত হয়।
◉ ৭. বিদ্রোহীদের যুদ্ধকৌশল
❖ ফকির-সন্ন্যাসীরা কোম্পানির নিয়মিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের পাশাপাশি গেরিলা যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করতেন।
❖ গেরিলা পদ্ধতিতে তাঁরা দ্রুত আক্রমণ করে স্থান পরিবর্তন করতেন।
❖ কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি, রাজস্ব অফিস ও অনুগত জমিদারদের কাচারি ছিল আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য।
❖ বিদ্রোহীরা তরবারি, বর্শা, বল্লম, বন্দুক এবং অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করতেন।
❖ কিছু ক্ষেত্রে অগ্নিনিক্ষেপক যন্ত্র ও হালকা কামান ব্যবহার করা হতো।
❖ যুদ্ধের সরঞ্জাম ও রসদ পরিবহনে উট ব্যবহারের বিবরণও পাওয়া যায়।
❖ স্থানীয় জঙ্গল, নদীপথ এবং দুর্গম ভূখণ্ড আন্দোলনকারীদের আত্মরক্ষা ও দ্রুত স্থানান্তরে সহায়তা করত।
◉ ৮. বিদ্রোহের পরিণতি ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
❖ কোম্পানি সরকার আন্দোলন দমনের জন্য সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।
❖ ৮ ডিসেম্বর ১৭৮৬ সালে কালেশ্বর এলাকায় কোম্পানি বাহিনীর সঙ্গে মজনু শাহের সংঘর্ষ ঘটে।
❖ এই যুদ্ধে মজনু শাহের বহু অনুসারী নিহত হন এবং তিনি আহত হয়ে থাকতে পারেন।
❖ বাংলাপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী, মজনু শাহ সম্ভবত ২৬ জানুয়ারি ১৭৮৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
❖ তাঁর মৃত্যুর পর মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ ও অন্যান্য নেতারা আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।
❖ অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে বিদ্রোহের তীব্রতা কমে যায়।
❖ পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ ১৮১২ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে।
❖ ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন পরবর্তী ব্রিটিশবিরোধী কৃষক ও গণআন্দোলনের প্রাথমিক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তগুলোর অন্যতম।
◈ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন
➤ বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ — ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ।
➤ ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রচলিত সময়কাল — ১৭৬০–১৮০০।
➤ ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সূচনা — অষ্টাদশ শতকে।
➤ বিদ্রোহের প্রধান নেতা — মজনু শাহ।
➤ মজনু শাহের সুফি তরিকা — মাদারিয়া।
➤ মজনু শাহের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী — মুসা শাহ।
➤ অন্য গুরুত্বপূর্ণ নেতা — চেরাগ আলী শাহ।
➤ সন্ন্যাসী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নেতা — ভবানী পাঠক।
➤ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নারী ব্যক্তিত্ব — দেবী চৌধুরানী।
➤ পলাশীর যুদ্ধ — ২৩ জুন ১৭৫৭।
➤ ঢাকার ইংরেজ বাণিজ্যকুঠিতে আক্রমণ — ১৭৬৩।
➤ বাকেরগঞ্জের কোম্পানি কুঠিতে আক্রমণ — ১৭৬৩।
➤ রামপুর বোয়ালিয়ার কোম্পানি কুঠিতে আক্রমণ — ১৭৬৩।
➤ ফকির-সন্ন্যাসীদের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্ষেত্র — রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও রাজশাহী।
➤ পূর্ববাংলার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্ষেত্র — ঢাকা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর।
➤ আন্দোলনের প্রধান আক্রমণস্থল — কোম্পানির কুঠি ও রাজস্ব অফিস।
➤ বিদ্রোহীদের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধকৌশল — গেরিলা আক্রমণ।
➤ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর — ১৭৬৯–১৭৭০।
➤ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের বাংলা সন — ১১৭৬।
➤ ঘোড়াঘাট অঞ্চলে কোম্পানির সঙ্গে সংঘর্ষ — ১৭৭১।
➤ রাজশাহীর রাজস্ব অফিসে মজনু শাহের অভিযান — ১৭৭২।
➤ মজনু শাহের গুরুত্বপূর্ণ শেষদিকের সংঘর্ষ — ৮ ডিসেম্বর ১৭৮৬।
➤ মজনু শাহের সম্ভাব্য মৃত্যুর তারিখ — ২৬ জানুয়ারি ১৭৮৮।
➤ মজনু শাহের মৃত্যুর পর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি — মুসা শাহ।
➤ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা — ১৮১২ সাল পর্যন্ত।
➤ সিপাহি বিদ্রোহ — ১৮৫৭।
➤ নীল বিদ্রোহ — ১৮৫৯–১৮৬০।
➤ আগস্ট আন্দোলন বা ভারত ছাড়ো আন্দোলন — ১৯৪২।"
◈ সঠিক উত্তর: ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (Fakir-Sannyasi Rebellion)।
◈ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
❖ ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল বাংলায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রথম দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন। এ আন্দোলনে মুসলিম সুফি ফকির, হিন্দু সন্ন্যাসী, কৃষক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ অংশগ্রহণ করে।
❖ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরবর্তী সময়ে কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া সুবিধা, রাজস্বনীতি এবং ধর্মীয় ভিক্ষুজীবী সম্প্রদায়ের চলাচল ও দান সংগ্রহে বিধিনিষেধের কারণে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
❖ ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন আনুমানিক ১৭৬০ সালে শুরু হয় এবং অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত প্রবলভাবে চলতে থাকে। সাধারণ জ্ঞান ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বইয়ে এর সময়কাল ১৭৬০–১৮০০ সাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মজনু শাহের মৃত্যুর পরও বিভিন্ন নেতার অধীনে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ ১৮১২ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
❖ এ আন্দোলনের প্রধান সংগঠক ও নেতা ছিলেন ফকির মজনু শাহ (Majnu Shah)। তিনি সুফি মাদারিয়া তরিকার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন এবং বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইংরেজ কোম্পানির বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠিত করেন।
❖ তাঁর নেতৃত্বে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও ঢাকাসহ উত্তর ও পূর্ব বাংলার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। এছাড়া বিহার, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, পূর্ণিয়া, মালদহ ও অন্যান্য অঞ্চলেও বিদ্রোহীদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
❖ আন্দোলনকারীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি, রাজস্ব অফিস, কোম্পানির অনুগত জমিদারদের কাচারি এবং রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের প্রতিষ্ঠান।
❖ ১৭৬৩ সালে ফকির-সন্ন্যাসীরা ঢাকার ইংরেজ বাণিজ্যকুঠি দখল করেন। ওই বছর বাকেরগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলেও কোম্পানির প্রতিষ্ঠানে আক্রমণের ঘটনা ঘটে।
❖ ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুধু ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না; অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক আধিপত্য, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অসন্তোষ একে বৃহত্তর প্রতিরোধ আন্দোলনে পরিণত করে।
◉ ১. ফকির ও সন্ন্যাসীদের পরিচয়
❖ ফকির (Fakir/Faqir) বলতে এখানে প্রধানত মুসলিম সুফি সাধক ও ধর্মীয় ভিক্ষুজীবী সম্প্রদায়ের সদস্যদের বোঝানো হয়েছে।
❖ বাংলায় ফকিরদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাদারিয়া সুফি তরিকা (Madariya Sufi Order)-র অনুসারী ছিলেন।
❖ মাদারিয়া তরিকা দক্ষিণ এশিয়ার সুফি ধারার একটি ঐতিহাসিক সম্প্রদায়।
❖ সন্ন্যাসী (Sannyasi) বলতে হিন্দু ধর্মীয় ত্যাগী, যোগী ও ভিক্ষুজীবী সাধকদের বোঝানো হয়।
❖ এ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসীদের মধ্যে গিরি ও পুরী সম্প্রদায়ের সদস্যদের উল্লেখ পাওয়া যায়।
❖ ফকির ও সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান, তীর্থকেন্দ্র, আখড়া ও খানকাহের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন।
❖ তাঁরা গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় জমিদারদের কাছ থেকে প্রচলিত নিয়মে দান গ্রহণ করতেন।
❖ অনেক দল সশস্ত্র অবস্থায় যাতায়াত করত এবং নিজেদের সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য অস্ত্র বহন করত।
❖ কোম্পানি প্রশাসনের নতুন বিধিনিষেধ তাঁদের প্রচলিত জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে।
◉ ২. ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান কারণ
❖ রাজনৈতিক কারণ: পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্ব বিস্তার।
❖ অর্থনৈতিক কারণ: কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা, রাজস্বনীতি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ।
❖ ভূমিরাজস্ব সমস্যা: কৃষকদের ওপর রাজস্ব সংগ্রহের কঠোরতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন।
❖ ধর্মীয় ও সামাজিক কারণ: ফকির ও সন্ন্যাসীদের প্রচলিত ভিক্ষা ও দান সংগ্রহে কোম্পানির বিধিনিষেধ।
❖ চলাচলে বাধা: ভিক্ষুজীবী ও তীর্থযাত্রী গোষ্ঠীর স্বাধীন যাতায়াতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ।
❖ জমিদারদের ভূমিকা: কোম্পানির অনুগত কিছু জমিদার ও রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্থানীয় অসন্তোষ।
❖ খাদ্যসংকট: ১৭৬৯–১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কারণে কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দুর্দশা বৃদ্ধি।
❖ রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন: কোম্পানির নতুন শাসনব্যবস্থা প্রচলিত স্থানীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট করে।
❖ এসব কারণের সমন্বয়ে বাংলায় ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে বিকশিত হয়।
◉ ৩. বিদ্রোহের প্রাথমিক ঘটনাপ্রবাহ
❖ ১৭৫৭ সাল: পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়।
❖ ১৭৬০ সাল: বাংলায় ফকির-সন্ন্যাসী প্রতিরোধের প্রাথমিক পর্যায়ের সূচনা।
❖ ১৭৬৩ সাল: আন্দোলন আরও সংগঠিত ও সশস্ত্র রূপ লাভ করে।
❖ ১৭৬৩ সালে বাকেরগঞ্জে বিদ্রোহীরা কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি আক্রমণ করে।
❖ তাঁরা কুঠির কর্মকর্তা মি. ক্যালীকে কয়েক দিন আটক রাখেন এবং বাণিজ্যকুঠিতে লুণ্ঠন চালান।
❖ একই বছর ঢাকার ইংরেজ বাণিজ্যকুঠি বিদ্রোহীদের দখলে যায়।
❖ ঢাকার ইংরেজ কর্মকর্তা র্যালফ লেস্টার (Ralph Lester) পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
❖ পরে ক্যাপ্টেন গ্র্যান্ট কোম্পানির পক্ষে ঢাকার কুঠি পুনর্দখল করেন।
❖ ১৭৬৩ সালে রাজশাহীর রামপুর বোয়ালিয়ায় কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি আক্রমণ করা হয়।
❖ এসব আক্রমণের মাধ্যমে বিদ্রোহীরা কোম্পানির বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়।
◉ ৪. উত্তরবঙ্গে আন্দোলনের বিস্তার
❖ ১৭৬৭ সালের দিকে রংপুর, রাজশাহী, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি ও কুমিল্লা অঞ্চলে বিদ্রোহীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়।
❖ কোম্পানি আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাবাহিনী প্রেরণ করে।
❖ ক্যাপ্টেন ডি. ম্যাকেঞ্জি-র নেতৃত্বে রংপুর অঞ্চলে কোম্পানির বাহিনী পাঠানো হয়।
❖ অন্য একটি সংঘর্ষে কোম্পানির পক্ষে প্রেরিত বাহিনীর কর্মকর্তা মার্টল নিহত হন।
❖ ১৭৬৮–১৭৭০ সালে বিহারের শরণ ও পূর্ণিয়া, উত্তরবঙ্গের রংপুর ও দিনাজপুর এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিদ্রোহীদের আক্রমণ অব্যাহত থাকে।
❖ ১৭৭১ সালে ঘোড়াঘাট ও গোবিন্দগঞ্জ অঞ্চলে কোম্পানি বাহিনীর সঙ্গে ফকির-সন্ন্যাসীদের সংঘর্ষ ঘটে।
❖ ১৭৭২ সালে মজনু শাহ রংপুর, রাজশাহী ও বগুড়ার বিভিন্ন কোম্পানি প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ চালান।
❖ এক পর্যায়ে বিদ্রোহীরা রাজশাহীর রাজস্ব অফিস সাময়িকভাবে দখল করেন।
❖ কোম্পানির রাজস্ব সংগ্রহে বাধা দেওয়া আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে ওঠে।
◉ ৫. মজনু শাহের নেতৃত্বে আন্দোলন
❖ মজনু শাহ ছিলেন ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান সংগঠক।
❖ তিনি সুফি মাদারিয়া তরিকার অনুসারী ও নেতা ছিলেন।
❖ তাঁর অধীনে বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক সশস্ত্র দল সংগঠিত হয়।
❖ মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ, পরাগল শাহ, সোবহান শাহ ও করিম শাহ তাঁর সহযোগী বা উত্তরসূরি নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
❖ মজনু শাহ উত্তরবঙ্গ ও পূর্ববাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত চলাচল করে বিদ্রোহীদের সংগঠিত করতেন।
❖ মহাস্থানগড় ও বগুড়া অঞ্চল তাঁর সামরিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর অন্যতম ছিল।
❖ গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের খাদ্য, আশ্রয় ও তথ্য সরবরাহ করত।
❖ কোম্পানির সেনাবাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে আগাম সংবাদ সংগ্রহে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
◉ ৬. ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের প্রভাব
❖ ১৭৬৯–১৭৭০ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়।
❖ বাংলা সন ১১৭৬-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় এটি ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।
❖ অনাবৃষ্টি, ফসলহানি, খাদ্য সরবরাহের সংকট এবং রাজস্বসংক্রান্ত চাপ দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা বৃদ্ধি করে।
❖ কৃষক, শ্রমজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
❖ গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
❖ ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন দুর্ভিক্ষের আগেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভিক্ষ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অসন্তোষকে আরও তীব্র করে।
❖ বহু দরিদ্র কৃষক ও স্থানীয় মানুষ বিদ্রোহীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।
❖ ফলে দুর্ভিক্ষ আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি হিসেবে বিবেচিত হয়।
◉ ৭. বিদ্রোহীদের যুদ্ধকৌশল
❖ ফকির-সন্ন্যাসীরা কোম্পানির নিয়মিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের পাশাপাশি গেরিলা যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করতেন।
❖ গেরিলা পদ্ধতিতে তাঁরা দ্রুত আক্রমণ করে স্থান পরিবর্তন করতেন।
❖ কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি, রাজস্ব অফিস ও অনুগত জমিদারদের কাচারি ছিল আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য।
❖ বিদ্রোহীরা তরবারি, বর্শা, বল্লম, বন্দুক এবং অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করতেন।
❖ কিছু ক্ষেত্রে অগ্নিনিক্ষেপক যন্ত্র ও হালকা কামান ব্যবহার করা হতো।
❖ যুদ্ধের সরঞ্জাম ও রসদ পরিবহনে উট ব্যবহারের বিবরণও পাওয়া যায়।
❖ স্থানীয় জঙ্গল, নদীপথ এবং দুর্গম ভূখণ্ড আন্দোলনকারীদের আত্মরক্ষা ও দ্রুত স্থানান্তরে সহায়তা করত।
◉ ৮. বিদ্রোহের পরিণতি ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
❖ কোম্পানি সরকার আন্দোলন দমনের জন্য সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।
❖ ৮ ডিসেম্বর ১৭৮৬ সালে কালেশ্বর এলাকায় কোম্পানি বাহিনীর সঙ্গে মজনু শাহের সংঘর্ষ ঘটে।
❖ এই যুদ্ধে মজনু শাহের বহু অনুসারী নিহত হন এবং তিনি আহত হয়ে থাকতে পারেন।
❖ বাংলাপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী, মজনু শাহ সম্ভবত ২৬ জানুয়ারি ১৭৮৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
❖ তাঁর মৃত্যুর পর মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ ও অন্যান্য নেতারা আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।
❖ অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে বিদ্রোহের তীব্রতা কমে যায়।
❖ পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ ১৮১২ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে।
❖ ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন পরবর্তী ব্রিটিশবিরোধী কৃষক ও গণআন্দোলনের প্রাথমিক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তগুলোর অন্যতম।
◈ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন
➤ বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ — ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ।
➤ ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রচলিত সময়কাল — ১৭৬০–১৮০০।
➤ ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সূচনা — অষ্টাদশ শতকে।
➤ বিদ্রোহের প্রধান নেতা — মজনু শাহ।
➤ মজনু শাহের সুফি তরিকা — মাদারিয়া।
➤ মজনু শাহের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী — মুসা শাহ।
➤ অন্য গুরুত্বপূর্ণ নেতা — চেরাগ আলী শাহ।
➤ সন্ন্যাসী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নেতা — ভবানী পাঠক।
➤ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নারী ব্যক্তিত্ব — দেবী চৌধুরানী।
➤ পলাশীর যুদ্ধ — ২৩ জুন ১৭৫৭।
➤ ঢাকার ইংরেজ বাণিজ্যকুঠিতে আক্রমণ — ১৭৬৩।
➤ বাকেরগঞ্জের কোম্পানি কুঠিতে আক্রমণ — ১৭৬৩।
➤ রামপুর বোয়ালিয়ার কোম্পানি কুঠিতে আক্রমণ — ১৭৬৩।
➤ ফকির-সন্ন্যাসীদের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্ষেত্র — রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও রাজশাহী।
➤ পূর্ববাংলার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্ষেত্র — ঢাকা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর।
➤ আন্দোলনের প্রধান আক্রমণস্থল — কোম্পানির কুঠি ও রাজস্ব অফিস।
➤ বিদ্রোহীদের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধকৌশল — গেরিলা আক্রমণ।
➤ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর — ১৭৬৯–১৭৭০।
➤ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের বাংলা সন — ১১৭৬।
➤ ঘোড়াঘাট অঞ্চলে কোম্পানির সঙ্গে সংঘর্ষ — ১৭৭১।
➤ রাজশাহীর রাজস্ব অফিসে মজনু শাহের অভিযান — ১৭৭২।
➤ মজনু শাহের গুরুত্বপূর্ণ শেষদিকের সংঘর্ষ — ৮ ডিসেম্বর ১৭৮৬।
➤ মজনু শাহের সম্ভাব্য মৃত্যুর তারিখ — ২৬ জানুয়ারি ১৭৮৮।
➤ মজনু শাহের মৃত্যুর পর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি — মুসা শাহ।
➤ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা — ১৮১২ সাল পর্যন্ত।
➤ সিপাহি বিদ্রোহ — ১৮৫৭।
➤ নীল বিদ্রোহ — ১৮৫৯–১৮৬০।
➤ আগস্ট আন্দোলন বা ভারত ছাড়ো আন্দোলন — ১৯৪২।"