01
🎯 Level 1
০২. দর্পণ বা আয়নার পিছনে কোন ধাতু ব্যবহৃত হয়? (প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক: ১২)
✅ সঠিক উত্তর:গ. মার্কারি
ব্যাখ্যা:
"উত্তর: গ
◈ বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভুল তথ্য: অতীতে আয়নার পেছনে পারদ (Mercury) ও টিন (Tin)-এর সংকর মিশ্রণ বা অ্যামালগাম ব্যবহার করা হতো। তবে আধুনিক আয়না তৈরিতে সাধারণত রূপা (Silver) অথবা অ্যালুমিনিয়াম (Aluminium)-এর পাতলা প্রতিফলক প্রলেপ ব্যবহার করা হয়।
✦ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
❖ দর্পণ বা আয়না (Mirror): যে মসৃণ পৃষ্ঠে আলো নিয়মিতভাবে প্রতিফলিত হয়ে বস্তুর প্রতিবিম্ব তৈরি করে, তাকে দর্পণ বা আয়না বলে।
সাধারণ কাচের আয়না তৈরির জন্য কাচের এক পাশে অত্যন্ত পাতলা ধাতব প্রতিফলক প্রলেপ দেওয়া হয়। এই প্রলেপের সাহায্যে আলো প্রতিফলিত হয়ে পর্যবেক্ষকের চোখে ফিরে আসে।
➤ আয়না আলোর প্রতিফলন নীতিতে কাজ করে।
➤ আয়নায় সাধারণত মসৃণ প্রতিফলক পৃষ্ঠ থাকে।
➤ কাচের পেছনে প্রতিফলক ধাতব প্রলেপ দেওয়া হয়।
➤ ধাতব প্রলেপ আলোকে প্রতিফলিত করে।
➤ প্রতিফলিত আলোর মাধ্যমে বস্তুর প্রতিবিম্ব দেখা যায়।
❖ আয়নার পেছনে মার্কারি ব্যবহারের ইতিহাস: প্রাচীন ও মধ্যযুগের বিভিন্ন সময়ে পালিশ করা ধাতব পৃষ্ঠ দিয়ে আয়না তৈরি করা হতো। পরে কাচের পেছনে ধাতব প্রলেপ ব্যবহার করে উন্নত আয়না তৈরি শুরু হয়।
বিশেষ করে ইউরোপে ষোড়শ শতাব্দী থেকে টিন ও পারদের মিশ্রণে তৈরি প্রতিফলক প্রলেপ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো।
এই পদ্ধতিতে—
➤ প্রথমে সমতল কাচ প্রস্তুত করা হতো।
➤ কাচের পেছনের অংশে টিনের পাত ব্যবহার করা হতো।
➤ টিনের সঙ্গে পারদ প্রয়োগ করা হতো।
➤ পারদ ও টিনের সংমিশ্রণে অ্যামালগাম তৈরি হতো।
➤ এই ধাতব স্তর আয়নার প্রতিফলক পৃষ্ঠ হিসেবে কাজ করত।
➤ ফলে কাচের সামনের দিক থেকে বস্তুটির প্রতিবিম্ব দেখা যেত।
এই ঐতিহাসিক পদ্ধতির কারণেই সাধারণ জ্ঞান ও পুরোনো চাকরির পরীক্ষায় আয়নার পেছনে ব্যবহৃত ধাতু হিসেবে মার্কারি বা পারদ উল্লেখ করা হয়।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের সংরক্ষণবিষয়ক গবেষণাতেও টিন-পারদ অ্যামালগামযুক্ত প্রাচীন আয়নার নির্মাণপদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে।
❖ অ্যামালগাম (Amalgam): পারদের সঙ্গে অন্য কোনো ধাতুর সংমিশ্রণে তৈরি সংকর পদার্থকে অ্যামালগাম বলে।
পুরোনো আয়নায় টিন-পারদ অ্যামালগাম ব্যবহার করা হতো।
➤ পারদের রাসায়নিক প্রতীক = Hg।
➤ টিনের রাসায়নিক প্রতীক = Sn।
➤ পারদ সাধারণ তাপমাত্রায় তরল ধাতু।
➤ টিন-পারদ অ্যামালগাম অতীতে প্রতিফলক প্রলেপ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
➤ পারদ বিষাক্ত হওয়ায় এই পদ্ধতি আধুনিক আয়না তৈরিতে পরিত্যক্ত হয়েছে।
❖ আধুনিক আয়না তৈরির পদ্ধতি (Modern Mirror Manufacturing): আধুনিক কাচের আয়নায় সাধারণত রূপা অথবা অ্যালুমিনিয়ামের অত্যন্ত পাতলা প্রলেপ ব্যবহার করা হয়।
রূপার প্রলেপযুক্ত আয়না:
➤ প্রথমে কাচের পৃষ্ঠ পরিষ্কার করা হয়।
➤ কাচের এক পাশে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় রূপার পাতলা স্তর তৈরি করা হয়।
➤ রূপার স্তর আলো প্রতিফলিত করে।
➤ ধাতব স্তরকে ক্ষয় ও আর্দ্রতা থেকে রক্ষার জন্য সুরক্ষামূলক আবরণ দেওয়া হয়।
অ্যালুমিনিয়ামের প্রলেপযুক্ত আয়না:
➤ বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাচের ওপর অ্যালুমিনিয়ামের পাতলা স্তর তৈরি করা হয়।
➤ ভ্যাকুয়াম ডিপোজিশন পদ্ধতিতে অ্যালুমিনিয়ামের প্রলেপ দেওয়া সম্ভব।
➤ অ্যালুমিনিয়াম দৃশ্যমান আলো ভালোভাবে প্রতিফলিত করতে পারে।
➤ বিভিন্ন অপটিক্যাল যন্ত্র ও দর্পণে অ্যালুমিনিয়ামের প্রলেপ ব্যবহার করা হয়।
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের Office for Science and Society অনুযায়ী, আধুনিক কাচের আয়নায় রূপা ও অ্যালুমিনিয়াম উভয় ধাতুই ব্যবহৃত হয়।
✦ আয়নার পেছনে ব্যবহৃত ধাতুর তুলনা:
❖ সিলভারিং (Silvering): আয়না তৈরির উদ্দেশ্যে কাচের পৃষ্ঠে প্রতিফলক ধাতব প্রলেপ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রচলিতভাবে সিলভারিং বলে।
বিশেষ করে রূপার প্রলেপ তৈরির রাসায়নিক পদ্ধতিকে সিলভারিং বলা হয়। তবে সব ধাতব প্রলেপের উৎপাদনপদ্ধতি একই নয়।
❖ আয়না কীভাবে প্রতিবিম্ব তৈরি করে? কোনো বস্তু থেকে আলো আয়নার প্রতিফলক পৃষ্ঠে আপতিত হলে প্রতিফলনের নিয়ম অনুযায়ী ফিরে আসে। প্রতিফলিত আলোকরশ্মি চোখে প্রবেশ করলে বস্তুটির প্রতিবিম্ব দেখা যায়।
আলোর প্রতিফলনের দুটি প্রধান সূত্র:
➤ আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি ও আপতনবিন্দুতে অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে অবস্থান করে।
➤ আপতন কোণ ও প্রতিফলন কোণ সমান।
অর্থাৎ,
∠i = ∠r
এখানে,
➤ i = আপতন কোণ।
➤ r = প্রতিফলন কোণ।
❖ নিয়মিত প্রতিফলন (Regular Reflection): সমান্তরাল আলোকরশ্মি কোনো মসৃণ পৃষ্ঠে আপতিত হয়ে প্রতিফলনের পরও সমান্তরাল থাকলে তাকে নিয়মিত প্রতিফলন বলে।
আয়নার মসৃণ প্রতিফলক পৃষ্ঠে এই ধরনের প্রতিফলন ঘটে।
✦ সমতল দর্পণে গঠিত প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য:
❖ প্রতিবিম্ব অসদ বা অবাস্তব (Virtual) হয়।
❖ প্রতিবিম্ব সোজা (Erect) হয়।
❖ প্রতিবিম্বের আকার বস্তুর সমান হয়।
❖ প্রতিবিম্ব দর্পণের পেছনে গঠিত বলে মনে হয়।
❖ দর্পণ থেকে বস্তুর দূরত্ব এবং দর্পণ থেকে প্রতিবিম্বের দূরত্ব সমান।
❖ প্রতিবিম্বে পার্শ্বীয় পরিবর্তন (Lateral Inversion) ঘটে।
❖ সমতল দর্পণের রৈখিক বিবর্ধন = +১।
✦ গাণিতিক উদাহরণ:
❖ প্রশ্ন: একটি বস্তু সমতল দর্পণের সামনে ৫ মিটার দূরে রাখা হয়েছে। দর্পণ থেকে প্রতিবিম্বের দূরত্ব কত?
আমরা জানি,
➤ সমতল দর্পণে বস্তুর দূরত্ব = প্রতিবিম্বের দূরত্বের পরম মান।
এখানে,
➤ বস্তুর দূরত্ব = ৫ মিটার।
সুতরাং,
➤ প্রতিবিম্বের দূরত্ব = ৫ মিটার।
অতএব, প্রতিবিম্বটি দর্পণের পেছনে ৫ মিটার দূরে অবস্থিত বলে মনে হবে।
বস্তু ও প্রতিবিম্বের মধ্যবর্তী দূরত্ব—
➤ = ৫ + ৫
➤ = ১০ মিটার।
অতএব, বস্তু ও প্রতিবিম্বের মধ্যবর্তী দূরত্ব হবে ১০ মিটার।
✦ মূল ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-সংশোধনী:
❖ “বর্তমানের সব আয়নায় মার্কারি ব্যবহার করা হয়”—এ বক্তব্য ভুল। মার্কারি মূলত প্রাচীন টিন-পারদ অ্যামালগাম আয়নার সঙ্গে সম্পর্কিত।
❖ “আয়নার পেছনে শুধু অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয়”—এটিও সঠিক নয়। আধুনিক আয়নায় রূপার প্রলেপও ব্যবহৃত হয়।
❖ “আয়নার পেছনে পারদ ও রূপা একই ধরনের প্রলেপ”—এ ধারণা ভুল। ঐতিহাসিক টিন-পারদ অ্যামালগাম এবং আধুনিক রূপার প্রলেপের রাসায়নিক গঠন ও নির্মাণপদ্ধতি আলাদা।
❖ “সিলভারিং মানেই মার্কারির প্রলেপ দেওয়া”—এটিও সঠিক নয়। সিলভারিং সাধারণত রূপার প্রতিফলক স্তর তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত।
❖ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Pitt Rivers Museum-এর প্রকাশনায় আধুনিক কাচের আয়নায় অ্যালুমিনিয়াম অথবা রূপার পাতলা ধাতব স্তর ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়।
❖ তাই প্রশ্নটিতে গ. মার্কারি প্রচলিত পরীক্ষাভিত্তিক উত্তর হলেও ক. অ্যালুমিনিয়ামও আধুনিক প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য। প্রশ্নে কোন সময়ের আয়না বোঝানো হয়েছে তা উল্লেখ না থাকায় বিকল্পগুলো পুরোপুরি দ্ব্যর্থহীন নয়।
◉ অন্য অপশনগুলোর বিশ্লেষণ:
❖ ক. অ্যালুমিনিয়াম ⇒ আধুনিক প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে সঠিক, তবে পরীক্ষার প্রত্যাশিত উত্তর নয়। অ্যালুমিনিয়াম ভালো আলোক প্রতিফলক এবং আধুনিক আয়নায় এর পাতলা প্রলেপ ব্যবহার করা হয়। তাই অ্যালুমিনিয়ামকে ভুল ধাতু বলা যাবে না।
❖ খ. জিংক ⇒ ভুল। জিংক বা দস্তা প্রধানত লোহা ও ইস্পাতকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করার জন্য গ্যালভানাইজিংয়ে ব্যবহৃত হয়। সাধারণ কাচের আয়নার প্রধান প্রতিফলক স্তর হিসেবে জিংক ব্যবহৃত হয় না।
❖ গ. মার্কারি ⇒ পরীক্ষাভিত্তিক সঠিক। ঐতিহাসিকভাবে আয়নার পেছনে টিন ও পারদের অ্যামালগাম ব্যবহার করা হতো। এই কারণে পুরোনো সাধারণ বিজ্ঞান ও চাকরির পরীক্ষায় মার্কারিকে সঠিক উত্তর হিসেবে ধরা হয়। এটিই প্রচলিত প্রশ্নসমাধান অনুযায়ী সঠিক উত্তর।
❖ ঘ. কপার ⇒ ভুল। কপার বা তামা কিছু আয়নার প্রতিফলক স্তরের পেছনে অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক আবরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে সাধারণ কাচের আয়নার প্রধান প্রতিফলক ধাতু হিসেবে কপার প্রচলিত নয়।
✦ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন:
❖ আয়নার পেছনে ব্যবহৃত ধাতুর এই প্রশ্নের প্রচলিত উত্তর—মার্কারি (পারদ)।
❖ পারদের ইংরেজি নাম—Mercury।
❖ পারদের রাসায়নিক প্রতীক—Hg।
❖ পারদের পারমাণবিক সংখ্যা—৮০।
❖ টিনের রাসায়নিক প্রতীক—Sn।
❖ রূপার রাসায়নিক প্রতীক—Ag।
❖ অ্যালুমিনিয়ামের রাসায়নিক প্রতীক—Al।
❖ তামার রাসায়নিক প্রতীক—Cu।
❖ জিংকের রাসায়নিক প্রতীক—Zn।
❖ সাধারণ তাপমাত্রায় তরল ধাতু—পারদ।
❖ প্রাচীন আয়নায় ব্যবহৃত সংকর প্রতিফলক—টিন-পারদ অ্যামালগাম।
❖ অ্যামালগাম হলো—পারদের সঙ্গে অন্য ধাতুর সংকর।
❖ আধুনিক কাচের আয়নায় ব্যবহৃত প্রতিফলক ধাতু—রূপা অথবা অ্যালুমিনিয়াম।
❖ কাচের পেছনে রূপার প্রলেপ তৈরির পদ্ধতি—সিলভারিং।
❖ আয়না কাজ করে—আলোর প্রতিফলন নীতিতে।
❖ প্রতিফলনের সূত্র—আপতন কোণ = প্রতিফলন কোণ।
❖ সমতল দর্পণের প্রতিবিম্ব—অসদ, সোজা ও সমান আকারের।
❖ সমতল দর্পণের বিবর্ধন—+১।
❖ সমতল দর্পণের প্রতিবিম্বে ঘটে—পার্শ্বীয় পরিবর্তন।
❖ সমতল দর্পণে বস্তুর দূরত্ব ও প্রতিবিম্বের দূরত্বের পরম মান—সমান।
❖ গাড়ির সাইড বা রিয়ারভিউ মিররে সাধারণত ব্যবহৃত হয়—উত্তল দর্পণ।
❖ দাঁতের চিকিৎসায় বড় প্রতিবিম্ব দেখার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে—অবতল দর্পণ।
❖ শেভিং বা মেকআপ মিররে বড় প্রতিবিম্ব পাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়—অবতল দর্পণ।
❖ টর্চলাইট ও গাড়ির হেডলাইটের প্রতিফলকে ব্যবহৃত হয়—অবতল বা প্যারাবলিক প্রতিফলক।
❖ গ্যালভানাইজিংয়ে ব্যবহৃত ধাতু—জিংক।
❖ ঐতিহাসিক টিন-পারদ আয়নার ব্যবহার কমে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ—পারদের বিষাক্ততা।"
◈ বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভুল তথ্য: অতীতে আয়নার পেছনে পারদ (Mercury) ও টিন (Tin)-এর সংকর মিশ্রণ বা অ্যামালগাম ব্যবহার করা হতো। তবে আধুনিক আয়না তৈরিতে সাধারণত রূপা (Silver) অথবা অ্যালুমিনিয়াম (Aluminium)-এর পাতলা প্রতিফলক প্রলেপ ব্যবহার করা হয়।
✦ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
❖ দর্পণ বা আয়না (Mirror): যে মসৃণ পৃষ্ঠে আলো নিয়মিতভাবে প্রতিফলিত হয়ে বস্তুর প্রতিবিম্ব তৈরি করে, তাকে দর্পণ বা আয়না বলে।
সাধারণ কাচের আয়না তৈরির জন্য কাচের এক পাশে অত্যন্ত পাতলা ধাতব প্রতিফলক প্রলেপ দেওয়া হয়। এই প্রলেপের সাহায্যে আলো প্রতিফলিত হয়ে পর্যবেক্ষকের চোখে ফিরে আসে।
➤ আয়না আলোর প্রতিফলন নীতিতে কাজ করে।
➤ আয়নায় সাধারণত মসৃণ প্রতিফলক পৃষ্ঠ থাকে।
➤ কাচের পেছনে প্রতিফলক ধাতব প্রলেপ দেওয়া হয়।
➤ ধাতব প্রলেপ আলোকে প্রতিফলিত করে।
➤ প্রতিফলিত আলোর মাধ্যমে বস্তুর প্রতিবিম্ব দেখা যায়।
❖ আয়নার পেছনে মার্কারি ব্যবহারের ইতিহাস: প্রাচীন ও মধ্যযুগের বিভিন্ন সময়ে পালিশ করা ধাতব পৃষ্ঠ দিয়ে আয়না তৈরি করা হতো। পরে কাচের পেছনে ধাতব প্রলেপ ব্যবহার করে উন্নত আয়না তৈরি শুরু হয়।
বিশেষ করে ইউরোপে ষোড়শ শতাব্দী থেকে টিন ও পারদের মিশ্রণে তৈরি প্রতিফলক প্রলেপ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো।
এই পদ্ধতিতে—
➤ প্রথমে সমতল কাচ প্রস্তুত করা হতো।
➤ কাচের পেছনের অংশে টিনের পাত ব্যবহার করা হতো।
➤ টিনের সঙ্গে পারদ প্রয়োগ করা হতো।
➤ পারদ ও টিনের সংমিশ্রণে অ্যামালগাম তৈরি হতো।
➤ এই ধাতব স্তর আয়নার প্রতিফলক পৃষ্ঠ হিসেবে কাজ করত।
➤ ফলে কাচের সামনের দিক থেকে বস্তুটির প্রতিবিম্ব দেখা যেত।
এই ঐতিহাসিক পদ্ধতির কারণেই সাধারণ জ্ঞান ও পুরোনো চাকরির পরীক্ষায় আয়নার পেছনে ব্যবহৃত ধাতু হিসেবে মার্কারি বা পারদ উল্লেখ করা হয়।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের সংরক্ষণবিষয়ক গবেষণাতেও টিন-পারদ অ্যামালগামযুক্ত প্রাচীন আয়নার নির্মাণপদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে।
❖ অ্যামালগাম (Amalgam): পারদের সঙ্গে অন্য কোনো ধাতুর সংমিশ্রণে তৈরি সংকর পদার্থকে অ্যামালগাম বলে।
পুরোনো আয়নায় টিন-পারদ অ্যামালগাম ব্যবহার করা হতো।
➤ পারদের রাসায়নিক প্রতীক = Hg।
➤ টিনের রাসায়নিক প্রতীক = Sn।
➤ পারদ সাধারণ তাপমাত্রায় তরল ধাতু।
➤ টিন-পারদ অ্যামালগাম অতীতে প্রতিফলক প্রলেপ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
➤ পারদ বিষাক্ত হওয়ায় এই পদ্ধতি আধুনিক আয়না তৈরিতে পরিত্যক্ত হয়েছে।
❖ আধুনিক আয়না তৈরির পদ্ধতি (Modern Mirror Manufacturing): আধুনিক কাচের আয়নায় সাধারণত রূপা অথবা অ্যালুমিনিয়ামের অত্যন্ত পাতলা প্রলেপ ব্যবহার করা হয়।
রূপার প্রলেপযুক্ত আয়না:
➤ প্রথমে কাচের পৃষ্ঠ পরিষ্কার করা হয়।
➤ কাচের এক পাশে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় রূপার পাতলা স্তর তৈরি করা হয়।
➤ রূপার স্তর আলো প্রতিফলিত করে।
➤ ধাতব স্তরকে ক্ষয় ও আর্দ্রতা থেকে রক্ষার জন্য সুরক্ষামূলক আবরণ দেওয়া হয়।
অ্যালুমিনিয়ামের প্রলেপযুক্ত আয়না:
➤ বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাচের ওপর অ্যালুমিনিয়ামের পাতলা স্তর তৈরি করা হয়।
➤ ভ্যাকুয়াম ডিপোজিশন পদ্ধতিতে অ্যালুমিনিয়ামের প্রলেপ দেওয়া সম্ভব।
➤ অ্যালুমিনিয়াম দৃশ্যমান আলো ভালোভাবে প্রতিফলিত করতে পারে।
➤ বিভিন্ন অপটিক্যাল যন্ত্র ও দর্পণে অ্যালুমিনিয়ামের প্রলেপ ব্যবহার করা হয়।
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের Office for Science and Society অনুযায়ী, আধুনিক কাচের আয়নায় রূপা ও অ্যালুমিনিয়াম উভয় ধাতুই ব্যবহৃত হয়।
✦ আয়নার পেছনে ব্যবহৃত ধাতুর তুলনা:
❖ সিলভারিং (Silvering): আয়না তৈরির উদ্দেশ্যে কাচের পৃষ্ঠে প্রতিফলক ধাতব প্রলেপ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রচলিতভাবে সিলভারিং বলে।
বিশেষ করে রূপার প্রলেপ তৈরির রাসায়নিক পদ্ধতিকে সিলভারিং বলা হয়। তবে সব ধাতব প্রলেপের উৎপাদনপদ্ধতি একই নয়।
❖ আয়না কীভাবে প্রতিবিম্ব তৈরি করে? কোনো বস্তু থেকে আলো আয়নার প্রতিফলক পৃষ্ঠে আপতিত হলে প্রতিফলনের নিয়ম অনুযায়ী ফিরে আসে। প্রতিফলিত আলোকরশ্মি চোখে প্রবেশ করলে বস্তুটির প্রতিবিম্ব দেখা যায়।
আলোর প্রতিফলনের দুটি প্রধান সূত্র:
➤ আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি ও আপতনবিন্দুতে অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে অবস্থান করে।
➤ আপতন কোণ ও প্রতিফলন কোণ সমান।
অর্থাৎ,
∠i = ∠r
এখানে,
➤ i = আপতন কোণ।
➤ r = প্রতিফলন কোণ।
❖ নিয়মিত প্রতিফলন (Regular Reflection): সমান্তরাল আলোকরশ্মি কোনো মসৃণ পৃষ্ঠে আপতিত হয়ে প্রতিফলনের পরও সমান্তরাল থাকলে তাকে নিয়মিত প্রতিফলন বলে।
আয়নার মসৃণ প্রতিফলক পৃষ্ঠে এই ধরনের প্রতিফলন ঘটে।
✦ সমতল দর্পণে গঠিত প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য:
❖ প্রতিবিম্ব অসদ বা অবাস্তব (Virtual) হয়।
❖ প্রতিবিম্ব সোজা (Erect) হয়।
❖ প্রতিবিম্বের আকার বস্তুর সমান হয়।
❖ প্রতিবিম্ব দর্পণের পেছনে গঠিত বলে মনে হয়।
❖ দর্পণ থেকে বস্তুর দূরত্ব এবং দর্পণ থেকে প্রতিবিম্বের দূরত্ব সমান।
❖ প্রতিবিম্বে পার্শ্বীয় পরিবর্তন (Lateral Inversion) ঘটে।
❖ সমতল দর্পণের রৈখিক বিবর্ধন = +১।
✦ গাণিতিক উদাহরণ:
❖ প্রশ্ন: একটি বস্তু সমতল দর্পণের সামনে ৫ মিটার দূরে রাখা হয়েছে। দর্পণ থেকে প্রতিবিম্বের দূরত্ব কত?
আমরা জানি,
➤ সমতল দর্পণে বস্তুর দূরত্ব = প্রতিবিম্বের দূরত্বের পরম মান।
এখানে,
➤ বস্তুর দূরত্ব = ৫ মিটার।
সুতরাং,
➤ প্রতিবিম্বের দূরত্ব = ৫ মিটার।
অতএব, প্রতিবিম্বটি দর্পণের পেছনে ৫ মিটার দূরে অবস্থিত বলে মনে হবে।
বস্তু ও প্রতিবিম্বের মধ্যবর্তী দূরত্ব—
➤ = ৫ + ৫
➤ = ১০ মিটার।
অতএব, বস্তু ও প্রতিবিম্বের মধ্যবর্তী দূরত্ব হবে ১০ মিটার।
✦ মূল ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-সংশোধনী:
❖ “বর্তমানের সব আয়নায় মার্কারি ব্যবহার করা হয়”—এ বক্তব্য ভুল। মার্কারি মূলত প্রাচীন টিন-পারদ অ্যামালগাম আয়নার সঙ্গে সম্পর্কিত।
❖ “আয়নার পেছনে শুধু অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয়”—এটিও সঠিক নয়। আধুনিক আয়নায় রূপার প্রলেপও ব্যবহৃত হয়।
❖ “আয়নার পেছনে পারদ ও রূপা একই ধরনের প্রলেপ”—এ ধারণা ভুল। ঐতিহাসিক টিন-পারদ অ্যামালগাম এবং আধুনিক রূপার প্রলেপের রাসায়নিক গঠন ও নির্মাণপদ্ধতি আলাদা।
❖ “সিলভারিং মানেই মার্কারির প্রলেপ দেওয়া”—এটিও সঠিক নয়। সিলভারিং সাধারণত রূপার প্রতিফলক স্তর তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত।
❖ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Pitt Rivers Museum-এর প্রকাশনায় আধুনিক কাচের আয়নায় অ্যালুমিনিয়াম অথবা রূপার পাতলা ধাতব স্তর ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়।
❖ তাই প্রশ্নটিতে গ. মার্কারি প্রচলিত পরীক্ষাভিত্তিক উত্তর হলেও ক. অ্যালুমিনিয়ামও আধুনিক প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য। প্রশ্নে কোন সময়ের আয়না বোঝানো হয়েছে তা উল্লেখ না থাকায় বিকল্পগুলো পুরোপুরি দ্ব্যর্থহীন নয়।
◉ অন্য অপশনগুলোর বিশ্লেষণ:
❖ ক. অ্যালুমিনিয়াম ⇒ আধুনিক প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে সঠিক, তবে পরীক্ষার প্রত্যাশিত উত্তর নয়। অ্যালুমিনিয়াম ভালো আলোক প্রতিফলক এবং আধুনিক আয়নায় এর পাতলা প্রলেপ ব্যবহার করা হয়। তাই অ্যালুমিনিয়ামকে ভুল ধাতু বলা যাবে না।
❖ খ. জিংক ⇒ ভুল। জিংক বা দস্তা প্রধানত লোহা ও ইস্পাতকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করার জন্য গ্যালভানাইজিংয়ে ব্যবহৃত হয়। সাধারণ কাচের আয়নার প্রধান প্রতিফলক স্তর হিসেবে জিংক ব্যবহৃত হয় না।
❖ গ. মার্কারি ⇒ পরীক্ষাভিত্তিক সঠিক। ঐতিহাসিকভাবে আয়নার পেছনে টিন ও পারদের অ্যামালগাম ব্যবহার করা হতো। এই কারণে পুরোনো সাধারণ বিজ্ঞান ও চাকরির পরীক্ষায় মার্কারিকে সঠিক উত্তর হিসেবে ধরা হয়। এটিই প্রচলিত প্রশ্নসমাধান অনুযায়ী সঠিক উত্তর।
❖ ঘ. কপার ⇒ ভুল। কপার বা তামা কিছু আয়নার প্রতিফলক স্তরের পেছনে অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক আবরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে সাধারণ কাচের আয়নার প্রধান প্রতিফলক ধাতু হিসেবে কপার প্রচলিত নয়।
✦ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন:
❖ আয়নার পেছনে ব্যবহৃত ধাতুর এই প্রশ্নের প্রচলিত উত্তর—মার্কারি (পারদ)।
❖ পারদের ইংরেজি নাম—Mercury।
❖ পারদের রাসায়নিক প্রতীক—Hg।
❖ পারদের পারমাণবিক সংখ্যা—৮০।
❖ টিনের রাসায়নিক প্রতীক—Sn।
❖ রূপার রাসায়নিক প্রতীক—Ag।
❖ অ্যালুমিনিয়ামের রাসায়নিক প্রতীক—Al।
❖ তামার রাসায়নিক প্রতীক—Cu।
❖ জিংকের রাসায়নিক প্রতীক—Zn।
❖ সাধারণ তাপমাত্রায় তরল ধাতু—পারদ।
❖ প্রাচীন আয়নায় ব্যবহৃত সংকর প্রতিফলক—টিন-পারদ অ্যামালগাম।
❖ অ্যামালগাম হলো—পারদের সঙ্গে অন্য ধাতুর সংকর।
❖ আধুনিক কাচের আয়নায় ব্যবহৃত প্রতিফলক ধাতু—রূপা অথবা অ্যালুমিনিয়াম।
❖ কাচের পেছনে রূপার প্রলেপ তৈরির পদ্ধতি—সিলভারিং।
❖ আয়না কাজ করে—আলোর প্রতিফলন নীতিতে।
❖ প্রতিফলনের সূত্র—আপতন কোণ = প্রতিফলন কোণ।
❖ সমতল দর্পণের প্রতিবিম্ব—অসদ, সোজা ও সমান আকারের।
❖ সমতল দর্পণের বিবর্ধন—+১।
❖ সমতল দর্পণের প্রতিবিম্বে ঘটে—পার্শ্বীয় পরিবর্তন।
❖ সমতল দর্পণে বস্তুর দূরত্ব ও প্রতিবিম্বের দূরত্বের পরম মান—সমান।
❖ গাড়ির সাইড বা রিয়ারভিউ মিররে সাধারণত ব্যবহৃত হয়—উত্তল দর্পণ।
❖ দাঁতের চিকিৎসায় বড় প্রতিবিম্ব দেখার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে—অবতল দর্পণ।
❖ শেভিং বা মেকআপ মিররে বড় প্রতিবিম্ব পাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়—অবতল দর্পণ।
❖ টর্চলাইট ও গাড়ির হেডলাইটের প্রতিফলকে ব্যবহৃত হয়—অবতল বা প্যারাবলিক প্রতিফলক।
❖ গ্যালভানাইজিংয়ে ব্যবহৃত ধাতু—জিংক।
❖ ঐতিহাসিক টিন-পারদ আয়নার ব্যবহার কমে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ—পারদের বিষাক্ততা।"