ব্যাখ্যা:
◈ সঠিক উত্তর: মুহম্মদ কুদরত-এ খুদা (Muhammad Qudrat-i-Khuda)।
◈ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
❖ ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা (১৯০০–১৯৭৭) ছিলেন উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত বাঙালি রসায়নবিদ, বিজ্ঞানলেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞানশিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চার জন্য মাতৃভাষাই সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে উপযোগী মাধ্যম।
❖ তাঁর মতে, বিজ্ঞানকে শুধু বিদেশি ভাষায় সীমাবদ্ধ রাখলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনগণের মধ্যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান যথাযথভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে না। তাই তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষা, পাঠ্যপুস্তক রচনা, বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নির্মাণ ও গবেষণার ফলাফল প্রচারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
❖ মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে তিনি ‘বাংলার মাধ্যমে বিজ্ঞান’ (১৯৩৬) শীর্ষক রচনা প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে ‘বিজ্ঞানের বিচিত্র কাহিনী’, ‘বিজ্ঞানের সরস কাহিনী’, ‘বিজ্ঞানের সূচনা’, ‘পরমাণু পরিচিতি’ ও চার খণ্ডের ‘জৈব রসায়ন’ গ্রন্থ রচনা করে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানসাহিত্য সমৃদ্ধ করেন।
❖ তিনি কেবল বিজ্ঞানবিষয়ক বই লেখেননি; গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, দেশীয় সম্পদের ব্যবহারিক গবেষণা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১. ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদার জীবন ও পরিচিতি
❖ পূর্ণ নাম: ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা (Muhammad Qudrat-i-Khuda)।
❖ জন্মসাল: ১৯০০।
❖ প্রচলিত জন্মতারিখ: ১ ডিসেম্বর ১৯০০।
❖ জন্মস্থান: মাড়গ্রাম, বীরভূম জেলা, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত।
❖ বর্তমান অবস্থান: পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
❖ মৃত্যু: ৩ নভেম্বর ১৯৭৭।
❖ মৃত্যুস্থান: ঢাকা, বাংলাদেশ।
❖ পিতা: খোন্দকার আবদুল মুকিত।
❖ মাতা: সৈয়দা ফাসিহা খাতুন।
❖ জাতীয় পরিচিতি: বাঙালি; পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী।
❖ পেশা: রসায়নবিদ, গবেষক, বিজ্ঞানলেখক ও শিক্ষাবিদ।
❖ বিশেষ গবেষণাক্ষেত্র: জৈব রসায়ন (Organic Chemistry)।
❖ বিশেষ পরিচিতি: বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সভাপতি।
❖ একুশে পদক: ১৯৭৬।
❖ স্বাধীনতা পুরস্কার: ১৯৮৪ (মরণোত্তর)।
✦ জন্মতারিখসংক্রান্ত তথ্য: অধিকাংশ প্রচলিত বাংলা জীবনীতে ১ ডিসেম্বর ১৯০০ উল্লেখিত হলেও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির জীবনীতে জন্মকাল মে ১৯০০ বলা হয়েছে। তবে জন্মসাল ১৯০০, জন্মস্থান মাড়গ্রাম এবং মৃত্যুর তারিখ ৩ নভেম্বর ১৯৭৭ সম্পর্কে ঐকমত্য রয়েছে।
২. শৈশব ও শিক্ষাজীবন
❖ কুদরত-এ-খুদা বীরভূম জেলার মাড়গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।
❖ পরে কলকাতায় মাদ্রাসা ও বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
❖ তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
❖ ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
❖ এমএসসি পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফলের জন্য স্বর্ণপদক লাভ করেন।
❖ পরে উচ্চতর গবেষণার জন্য ইংল্যান্ডে যান।
❖ লন্ডনের Imperial College of Science and Technology-তে গবেষণা করেন।
❖ ১৯২৯ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে D.Sc. ডিগ্রি অর্জন করেন।
❖ একই সময়ে Imperial College-এর DIC (Diploma of Imperial College) অর্জন করেন।
৩. মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চাকে কেন উপযোগী মনে করতেন?
❖ কুদরত-এ-খুদা উপলব্ধি করেছিলেন যে বিজ্ঞানশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়; বরং বৈজ্ঞানিক ধারণা বোঝা, যুক্তিভিত্তিক চিন্তা করা এবং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগ করা।
❖ শিক্ষার্থী তার পরিচিত ভাষায় জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণা ব্যাখ্যা পেলে অনেক ক্ষেত্রে তা সহজে অনুধাবন করতে পারে।
❖ বিদেশি ভাষায় দুর্বলতা থাকলে বিজ্ঞান শেখার ক্ষেত্রে ভাষাগত বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
❖ মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক থাকলে গ্রামাঞ্চলসহ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে বিজ্ঞান পৌঁছানো সহজ হয়।
❖ মাতৃভাষায় বৈজ্ঞানিক পরিভাষা তৈরি হলে উচ্চতর জ্ঞান, গবেষণার ফলাফল ও প্রযুক্তিগত তথ্য স্থানীয়ভাবে প্রচার করা সম্ভব হয়।
❖ তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞানকে গণমানুষের জ্ঞানে পরিণত করতে বাংলা ভাষার বিকাশ অপরিহার্য।
৪. ‘বাংলার মাধ্যমে বিজ্ঞান’ — ১৯৩৬
❖ ১৯৩৬ সালে কুদরত-এ-খুদা ‘বাংলার মাধ্যমে বিজ্ঞান’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা প্রকাশ করেন।
❖ এতে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
❖ তিনি বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক আলোচনা অসম্ভব—এমন ধারণার বিরোধিতা করেন।
❖ বিজ্ঞান শিক্ষার উপযোগী শব্দভান্ডার ও পরিভাষা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
❖ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানসাহিত্য রচনা ও পাঠ্যপুস্তক তৈরির মাধ্যমে এই আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন।
৫. বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ রচনা
◉ বিজ্ঞানের বিচিত্র কাহিনী
❖ তাঁর বিখ্যাত জনপ্রিয় বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থগুলোর একটি।
❖ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ঘটনা ও ধারণা সাধারণ পাঠকের উপযোগী ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
◉ বিজ্ঞানের সরস কাহিনী
❖ বিজ্ঞানের বিষয়গুলোকে আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে রচিত।
❖ শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ।
◉ বিজ্ঞানের সূচনা
❖ বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণা ও মৌলিক বিষয় সম্পর্কে রচিত গ্রন্থ।
❖ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষা সম্প্রসারণের তাঁর প্রচেষ্টার নিদর্শন।
◉ জৈব রসায়ন — চার খণ্ড
❖ উচ্চতর রসায়নশিক্ষার জন্য বাংলা ভাষায় রচিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।
❖ চার খণ্ডে রচিত হওয়া এই গ্রন্থ বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার পাঠ্যবই নির্মাণের অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।
❖ এর চতুর্থ খণ্ড ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয়।
◉ পরমাণু পরিচিতি
❖ পরমাণু ও পদার্থের গঠনসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক ধারণা উপস্থাপনকারী গ্রন্থ।
◉ পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প সম্ভাবনা
❖ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পায়ন ও স্থানীয় সম্পদের ব্যবহারিক সম্ভাবনা নিয়ে রচিত।
◉ কলেজ কিমিয়ার কথা (১৯৭৩)
❖ কলেজ পর্যায়ের রসায়নশিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত বাংলা গ্রন্থ।
❖ বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার বিজ্ঞানসামগ্রী তৈরির উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
৬. বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী প্রকাশ ও সম্পাদনা
❖ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক জ্ঞান প্রচারের জন্য কুদরত-এ-খুদা সাময়িকী প্রকাশ ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
◉ পুরোগামী বিজ্ঞান — ১৯৬৩
❖ ১৯৬৩ সালে ‘পুরোগামী বিজ্ঞান’ নামে বিজ্ঞান সাময়িকী প্রকাশে ভূমিকা রাখেন।
❖ এতে বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারা সাধারণ পাঠকদের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
◉ বিজ্ঞানের জয়যাত্রা — ১৯৭২
❖ ১৯৭২ সালে ‘বিজ্ঞানের জয়যাত্রা’ নামে আরেকটি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী প্রকাশ ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
❖ এর মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে বিজ্ঞানশিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসারের চেষ্টা করেন।
৭. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব
❖ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) বাংলা ভাষায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
❖ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রকাশের বিষয়ে কুদরত-এ-খুদার চিন্তাধারায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল।
❖ ১৯৩৬ সালে একটি শিক্ষাবিষয়ক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ‘শিক্ষার সাঙ্গীকরণ’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন।
❖ মাতৃভাষায় শিক্ষা, জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা ও শিক্ষার সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা কুদরত-এ-খুদাকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
❖ বাংলা ভাষায় উচ্চতর বিজ্ঞানশিক্ষার পাঠ্যপুস্তক নির্মাণে কুদরত-এ-খুদা পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
৮. জৈব রসায়নে গবেষণা
❖ কুদরত-এ-খুদার প্রধান গবেষণাক্ষেত্র ছিল Organic Chemistry বা জৈব রসায়ন।
❖ কার্বনযুক্ত যৌগ, জৈব রাসায়নিক গঠন ও দেশীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারিক সম্ভাবনা নিয়ে তিনি গবেষণা করেন।
❖ উদ্ভিদ থেকে জৈব রাসায়নিক উপাদান সংগ্রহ, পাট ও পাটজাত উপকরণ এবং শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য পদার্থ নিয়ে তাঁর গবেষণা উল্লেখযোগ্য।
❖ পাটকাঠি থেকে কাগজ তৈরির মণ্ড (Paper Pulp) উৎপাদনের পদ্ধতি উদ্ভাবনে তাঁর অবদান ছিল।
❖ দেশীয় সম্পদকে শিল্পের কাঁচামালে রূপান্তর করার বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা অনুসন্ধান করেন।
❖ তাঁর গবেষণা বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প ও বিজ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
৯. বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অবদান
❖ ১৯৫৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের পূর্বাঞ্চলীয় গবেষণাগারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
❖ তিনি ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এই গবেষণাগারের নেতৃত্ব দেন।
❖ প্রতিষ্ঠানটির উত্তরসূরি হলো বর্তমান বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR)-এর গবেষণা কার্যক্রম।
❖ BCSIR-এর পূর্ণরূপ: Bangladesh Council of Scientific and Industrial Research।
❖ বাংলা নাম: বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ।
❖ BCSIR বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
❖ এর গবেষণার উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে দেশীয় সম্পদের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, শিল্পক্ষেত্রে গবেষণা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন।
১০. বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমিতে অবদান
❖ ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি (Bangladesh Academy of Sciences) প্রতিষ্ঠিত হয়।
❖ কুদরত-এ-খুদা ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
❖ তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ফেলো (Foundation Fellow) ছিলেন।
❖ বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মধ্যে সহযোগিতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণার মানোন্নয়ন এবং বিজ্ঞানশিক্ষা সম্প্রসারণে একাডেমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১১. কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন — ১৯৭২
❖ স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ২৬ জুলাই ১৯৭২ সালে প্রথম জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়।
❖ কমিশনের সভাপতি নিযুক্ত হন ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা।
❖ তাঁর নামানুসারে এটি কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন নামে পরিচিত।
❖ বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা ছিল কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য।
❖ কমিশন শিক্ষাকে বিজ্ঞানমনস্ক, গণমুখী, কর্মমুখী ও জাতীয় প্রয়োজনের উপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দেয়।
১২. শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন
❖ কমিশন ৮ জুন ১৯৭৩ সালে একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দেয়।
❖ ৩০ মে ১৯৭৪ সালে চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে পেশ করে।
❖ প্রতিবেদনটি ‘বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট’ নামে প্রকাশিত হয়।
❖ পরবর্তীকালে এটি কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট নামে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
❖ স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম পরিকল্পনার ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
১৩. কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ
◉ প্রাথমিক শিক্ষা
❖ প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়।
❖ শিক্ষার সুযোগ বিস্তার ও বৈষম্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
◉ মাধ্যমিক শিক্ষা
❖ নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত চার বছর মেয়াদি মাধ্যমিক শিক্ষার কাঠামো প্রস্তাব করা হয়।
❖ সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
◉ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা
❖ বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসার এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
❖ শিক্ষার্থীদের বাস্তবজীবনের সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞান ব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তোলার ধারণা সামনে আনা হয়।
◉ মাতৃভাষায় শিক্ষাদান
❖ শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
❖ উপযুক্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক পাঠ্যপুস্তক প্রস্তুতের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হয়।
◉ কর্মমুখী শিক্ষা
❖ উৎপাদন, কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
❖ ব্যবহারিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।
১৪. জাতীয় শিক্ষায় তাঁর দর্শন
❖ কুদরত-এ-খুদা মনে করতেন, শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের উপায় নয়; বরং জ্ঞান, দক্ষতা, যুক্তিবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের মাধ্যম।
❖ বিজ্ঞানশিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা ও বাস্তবমুখী চিন্তা গড়ে ওঠে।
❖ মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শেখার সুযোগ থাকলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী শিক্ষার উপকার লাভ করতে পারে।
❖ দেশীয় বিজ্ঞান গবেষণা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
❖ এসব ধারণার প্রতিফলন তাঁর বাংলা বিজ্ঞানগ্রন্থ, গবেষণা কার্যক্রম ও শিক্ষা কমিশনের কাজে দেখা যায়।
১৫. একুশে পদক — ১৯৭৬
❖ ১৯৭৬ সালে কুদরত-এ-খুদা একুশে পদক লাভ করেন।
❖ শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।
❖ একুশে পদক বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা।
❖ ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে পদকটির নামকরণ করা হয়েছে।
১৬. স্বাধীনতা পুরস্কার — ১৯৮৪
❖ ১৯৮৪ সালে কুদরত-এ-খুদাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।
❖ পুরস্কারের ক্ষেত্র ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি।
❖ স্বাধীনতা পুরস্কার বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা।
❖ তিনি মৃত্যুর সাত বছর পর এই পুরস্কারে ভূষিত হন।
১৭. জীবনের শেষ পর্যায় ও মৃত্যু
❖ ১৯৭৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
❖ জীবনের শেষ পর্যায়েও বিজ্ঞানশিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
❖ ৩ নভেম্বর ১৯৭৭ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
❖ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষা, জৈব রসায়ন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনায় তাঁর অবদান বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও শিক্ষার ইতিহাসে স্থায়ী গুরুত্ব বহন করে।
১৮. মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব
❖ জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮–১৯৩৭) বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ রচনা এবং উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় সাড়া নিয়ে গবেষণার জন্য বিখ্যাত। তাঁর উল্লেখযোগ্য বাংলা গ্রন্থ ‘অব্যক্ত’ (১৯২১)।
❖ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক ‘বিশ্বপরিচয়’ (১৯৩৭) রচনা করেন। এটি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সহজভাবে উপস্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
❖ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫–১৯৬৯) ছিলেন ভাষাবিজ্ঞানী, বহুভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক চিন্তায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
❖ সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৮৯৪–১৯৭৪) মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রবক্তা। ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ প্রতিষ্ঠা এবং ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকা প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
❖ মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা (১৯০০–১৯৭৭) মাতৃভাষায় বিজ্ঞান পাঠদান, বিজ্ঞানবিষয়ক পাঠ্যপুস্তক রচনা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে বিশেষ অবদান রাখেন।
◈ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন
➤ বিজ্ঞানচর্চায় মাতৃভাষাকে সবচেয়ে উপযোগী বলে বিবেচনা করতেন — মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা।
➤ তাঁর প্রধান পরিচিতি — বিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, বিজ্ঞানলেখক ও শিক্ষাবিদ।
➤ প্রধান গবেষণাক্ষেত্র — জৈব রসায়ন।
➤ জন্মসাল — ১৯০০।
➤ প্রচলিত জন্মতারিখ — ১ ডিসেম্বর ১৯০০।
➤ জন্মস্থান — মাড়গ্রাম, বীরভূম।
➤ বর্তমান অবস্থান — পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
➤ পিতা — খোন্দকার আবদুল মুকিত।
➤ মাতা — সৈয়দা ফাসিহা খাতুন।
➤ মৃত্যু — ৩ নভেম্বর ১৯৭৭।
➤ মৃত্যুর স্থান — ঢাকা।
➤ রসায়নে এমএসসি — ১৯২৪।
➤ এমএসসি অধ্যয়নের প্রতিষ্ঠান — কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
➤ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান — Imperial College, London।
➤ D.Sc. ডিগ্রি অর্জন — ১৯২৯।
➤ ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় — লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়।
➤ মাতৃভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষাবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ রচনা — বাংলার মাধ্যমে বিজ্ঞান।
➤ ‘বাংলার মাধ্যমে বিজ্ঞান’ প্রকাশ — ১৯৩৬।
➤ বিখ্যাত জনপ্রিয় বিজ্ঞানগ্রন্থ — বিজ্ঞানের বিচিত্র কাহিনী।
➤ আরেকটি গ্রন্থ — বিজ্ঞানের সরস কাহিনী।
➤ বিজ্ঞানবিষয়ক প্রাথমিক গ্রন্থ — বিজ্ঞানের সূচনা।
➤ পরমাণুবিষয়ক গ্রন্থ — পরমাণু পরিচিতি।
➤ উচ্চতর রসায়নের বাংলা গ্রন্থ — জৈব রসায়ন।
➤ ‘জৈব রসায়ন’ মোট খণ্ড — ৪টি।
➤ জৈব রসায়নের চতুর্থ খণ্ড প্রকাশ — ১৯৭১।
➤ ‘কলেজ কিমিয়ার কথা’ — ১৯৭৩।
➤ শিল্পসম্পর্কিত গ্রন্থ — পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প সম্ভাবনা।
➤ বিজ্ঞান সাময়িকী — পুরোগামী বিজ্ঞান (১৯৬৩)।
➤ আরেকটি বিজ্ঞান সাময়িকী — বিজ্ঞানের জয়যাত্রা (১৯৭২)।
➤ শিল্প গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান — পাটকাঠি থেকে কাগজের মণ্ড উৎপাদনের পদ্ধতি।
➤ পূর্বাঞ্চলীয় বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে যোগদান — ১৯৫৫।
➤ গবেষণাগার পরিচালনার সময় — ১৯৫৫–১৯৬৬।
➤ BCSIR-এর পূর্ণরূপ — Bangladesh Council of Scientific and Industrial Research।
➤ বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি প্রতিষ্ঠা — ১৯৭৩।
➤ বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি — মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা।
➤ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় শিক্ষা কমিশন — ১৯৭২।
➤ শিক্ষা কমিশন গঠন — ২৬ জুলাই ১৯৭২।
➤ প্রথম জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সভাপতি — ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা।
➤ কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন — ৮ জুন ১৯৭৩।
➤ চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ — ৩০ মে ১৯৭৪।
➤ প্রতিবেদনটির নাম — বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট।
➤ কমিশনের প্রধান সুপারিশগুলোর একটি — অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ।
➤ প্রস্তাবিত মাধ্যমিক শিক্ষা — নবম–দ্বাদশ শ্রেণি।
➤ শিক্ষাব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব — বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কর্মমুখী শিক্ষা ও মাতৃভাষা।
➤ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর — ১৯৭৫ থেকে।
➤ একুশে পদক লাভ — ১৯৭৬।
➤ স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ — ১৯৮৪ (মরণোত্তর)।
➤ স্বাধীনতা পুরস্কারের ক্ষেত্র — বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি।
➤ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থের রচয়িতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
➤ ‘বিশ্বপরিচয়’ প্রকাশ — ১৯৩৭।
➤ জগদীশচন্দ্র বসুর বাংলা বিজ্ঞানপ্রবন্ধের সংকলন — অব্যক্ত (১৯২১)।
➤ বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা — সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
➤ বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ প্রতিষ্ঠা — ১৯৪৭।
➤ বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের মুখপত্র — জ্ঞান ও বিজ্ঞান।
➤ বাংলা ভাষার মর্যাদা ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি — ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
➤ বিশেষ পরীক্ষার পার্থক্য: বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষাকে সর্বাধিক উপযোগী মনে করার প্রশ্ন—কুদরত-এ-খুদা; ‘বিশ্বপরিচয়’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; ‘অব্যক্ত’—জগদীশচন্দ্র বসু; বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ—সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
➤ চূড়ান্ত পরীক্ষার উত্তর — গ. মুহম্মদ কুদরত-এ খুদা।