ব্যাখ্যা:
উত্তর: খ
◈ প্রচলিত পরীক্ষাভিত্তিক সঠিক উত্তর: সাড়ে তিন হাজার।
❖ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
ভাষা হলো মানুষের মনের ভাব, চিন্তা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভাষাগত বৈচিত্র্য রয়েছে।
❖ বাংলাদেশের পুরোনো নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যক্রমে পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
❖ ২০০৬ সালের উপজেলা সমাজসেবা অফিসার নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নটির প্রচলিত সমাধানও এই পুরোনো পাঠ্যক্রমের তথ্য অনুসরণ করে তৈরি।
❖ তাই প্রদত্ত প্রশ্নের প্রত্যাশিত উত্তর খ. সাড়ে তিন হাজার।
❖ তবে আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক গবেষণায় পৃথিবীতে জীবিত ভাষার সংখ্যা অনেক বেশি পাওয়া যায়।
❖ জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা UNESCO-এর তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ৭,০০০ ভাষা বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
❖ অন্যদিকে, Ethnologue-এর ২০২৬ সালের ২৯তম সংস্করণ অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রায় ৭,১৭০টি জীবিত ভাষা রয়েছে।
❖ সুতরাং ২০০৬ সালের পরীক্ষার প্রচলিত উত্তর এবং ২০২৬ সালের আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক তথ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
✦ ১. পুরোনো পাঠ্যপুস্তক অনুযায়ী ভাষার সংখ্যা
❖ বাংলাদেশের পুরোনো বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভাষা প্রচলিত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
❖ বিভিন্ন পুরোনো সাধারণ জ্ঞান ও নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংকে ৩,৫০০ ভাষার তথ্য পাওয়া যায়।
❖ এই সংখ্যা একটি পুরোনো আনুমানিক হিসাব, যা আধুনিক ভাষা-তালিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
❖ তাই পুরোনো পরীক্ষার উত্তর হিসেবে সাড়ে তিন হাজার গ্রহণযোগ্য হলেও বর্তমান পৃথিবীর ভাষার প্রকৃত সংখ্যা বোঝাতে এটি ব্যবহার করা উচিত নয়।
✦ ২. UNESCO অনুযায়ী পৃথিবীর ভাষার সংখ্যা
❖ UNESCO-এর World Atlas of Languages-সংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী পৃথিবীতে মোট ৮,৩২৪টি ভাষা নথিভুক্ত হয়েছে।
❖ এর মধ্যে প্রায় ৭,০০০টি ভাষা বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
❖ সব নথিভুক্ত ভাষা বর্তমানে জীবিত নয়। কিছু ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে এবং কিছু ভাষা আর নিয়মিত কথ্য ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।
❖ UNESCO-এর হিসাবে প্রায় ১,৫০০টি ভাষা অদূর ভবিষ্যতে ব্যবহারকারী হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
❖ ভাষার সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবনের গুরুত্ব তুলে ধরতে জাতিসংঘ ২০২২–২০৩২ সময়কালকে আদিবাসী ভাষার আন্তর্জাতিক দশক (International Decade of Indigenous Languages) হিসেবে ঘোষণা করেছে।
✦ ৩. Ethnologue অনুযায়ী পৃথিবীর ভাষার সংখ্যা
❖ Ethnologue বিশ্বের ভাষাসমূহের তথ্য সংগ্রহ ও শ্রেণিবিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক গবেষণাভিত্তিক প্রকাশনা।
❖ এর মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষার নাম, ব্যবহারকারী, ভৌগোলিক বিস্তৃতি, ভাষাপরিবার এবং ভাষার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা হয়।
❖ Ethnologue-এর সাম্প্রতিক সংস্করণ অনুযায়ী জীবিত ভাষার সংখ্যা—
সাল | জীবিত ভাষার সংখ্যা
২০২১ | ৭,১৩৯
২০২২ | ৭,১৫১
২০২৩ | ৭,১৬৮
২০২৪ | ৭,১৬৪
২০২৫ | ৭,১৫৯
২০২৬ | ৭,১৭০
❖ ২০২৬ সালের ২৯তম সংস্করণে ৭,১৭০টি জীবিত ভাষা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
❖ বিভিন্ন বছরে ভাষার সংখ্যা বাড়া বা কমার অর্থ এই নয় যে সব পরিবর্তন নতুন ভাষার জন্ম বা পুরোনো ভাষার বিলুপ্তির কারণে ঘটেছে।
❖ নতুন ভাষা শনাক্তকরণ, তথ্য সংশোধন এবং ভাষা ও উপভাষার শ্রেণিবিভাগ পরিবর্তনের কারণেও এই সংখ্যায় পার্থক্য দেখা যায়।
✦ ৪. ভাষার সংখ্যা নির্ধারণে পার্থক্য হওয়ার কারণ
বিশ্বে মোট কতগুলো ভাষা রয়েছে, তার একটি চিরস্থায়ী ও সর্বজনস্বীকৃত নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।
এর প্রধান কারণগুলো হলো—
❖ ভাষা ও উপভাষার পার্থক্য: কোনো ভাষার আঞ্চলিক রূপকে পৃথক ভাষা হিসেবে গণনা করা হবে কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে।
❖ নতুন ভাষার শনাক্তকরণ: প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যবহৃত কিছু ভাষা আগে নথিভুক্ত না থাকলেও পরবর্তী সময়ে গবেষণার মাধ্যমে শনাক্ত হতে পারে।
❖ ভাষার বিলুপ্তি: কোনো ভাষার শেষ মাতৃভাষী বক্তার মৃত্যুর পর সেই ভাষার জীবিত ব্যবহার শেষ হয়ে যেতে পারে।
❖ শ্রেণিবিভাগের পরিবর্তন: গবেষণার নতুন তথ্যের ভিত্তিতে দুটি ভাষাকে একই ভাষার রূপ অথবা একটি ভাষাকে একাধিক স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হতে পারে।
❖ গবেষণা-পদ্ধতির পার্থক্য: UNESCO, Ethnologue ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষাতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠান ভাষা গণনার ক্ষেত্রে কিছু ভিন্ন মানদণ্ড ব্যবহার করে।
✦ ৫. ভাষাপরিবার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ভাষাবিজ্ঞানীরা ঐতিহাসিক ও গঠনগত সম্পর্কের ভিত্তিতে পৃথিবীর ভাষাগুলোকে বিভিন্ন ভাষাপরিবারে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাপরিবার ও উদাহরণ—
ভাষাপরিবার | ভাষার উদাহরণ
ইন্দো-ইউরোপীয় | বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ফরাসি
চীনা-তিব্বতি | মান্দারিন চীনা, বর্মি, তিব্বতি
আফ্রো-এশীয় | আরবি, হিব্রু, আমহারীয়
দ্রাবিড় | তামিল, তেলুগু, কন্নড়
অস্ট্রো-এশীয় | সাঁওতালি, মুন্ডারি, খমের
নাইজার-কঙ্গো | সোয়াহিলি, জুলু, ইগবো
অস্ট্রোনেশীয় | মালয়, ইন্দোনেশীয়, তাগালগ
❖ বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের ইন্দো-ইরানীয় শাখার ইন্দো-আর্য উপশাখার অন্তর্ভুক্ত।
❖ ভাষাপরিবারের সংখ্যা এবং পৃথিবীর মোট ভাষার সংখ্যা এক বিষয় নয়।
❖ একটি ভাষাপরিবারের অন্তর্ভুক্ত একাধিক ভাষা থাকতে পারে।
◉ অন্যান্য অপশনগুলোর বিশ্লেষণ
❖ ক. পাঁচ হাজার — প্রদত্ত পুরোনো প্রশ্নের প্রত্যাশিত উত্তর নয়।
২০০৬ সালের পরীক্ষার প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক হিসাবে সাড়ে তিন হাজার ভাষার উল্লেখ রয়েছে। তাই পাঁচ হাজার প্রশ্নটির নির্ধারিত উত্তর নয়। আবার ২০২৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী এই সংখ্যাও বর্তমান জীবিত ভাষার প্রকৃত হিসাবের চেয়ে কম।
❖ খ. সাড়ে তিন হাজার — প্রচলিত পরীক্ষাভিত্তিক সঠিক উত্তর।
বাংলাদেশের পুরোনো নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যক্রমে পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভাষা প্রচলিত থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তাই ২০০৬ সালের প্রশ্নের প্রচলিত সমাধানে খ বিকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এটি আধুনিক হিসাব নয়।
❖ গ. এক হাজার — ভুল।
পৃথিবীর জীবিত ভাষার সংখ্যা এক হাজারের অনেক বেশি। পুরোনো পাঠ্যপুস্তক এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক গবেষণা—উভয় ক্ষেত্রেই এই সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি ভাষার তথ্য পাওয়া যায়।
❖ ঘ. আড়াই হাজার — ভুল।
আড়াই হাজার বা ২,৫০০ ভাষা পৃথিবীর মোট জীবিত ভাষার সঠিক সংখ্যা নয়। পুরোনো পরীক্ষাভিত্তিক হিসাবে সাড়ে তিন হাজার এবং আধুনিক হিসাবে প্রায় সাত হাজারের বেশি ভাষা পাওয়া যায়।
✦ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন
❖ ২০০৬ সালের উপজেলা সমাজসেবা অফিসার পরীক্ষার প্রচলিত উত্তর — সাড়ে তিন হাজার।
❖ বাংলাদেশের পুরোনো বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যক্রমে পৃথিবীর প্রচলিত ভাষার সংখ্যা — প্রায় সাড়ে তিন হাজার।
❖ UNESCO অনুযায়ী বর্তমানে ব্যবহৃত ভাষার সংখ্যা — প্রায় ৭,০০০।
❖ Ethnologue-এর ২০২৬ সালের সংস্করণ অনুযায়ী জীবিত ভাষার সংখ্যা — ৭,১৭০।
❖ UNESCO অনুযায়ী মোট নথিভুক্ত ভাষার সংখ্যা — ৮,৩২৪।
❖ UNESCO অনুযায়ী অদূর ভবিষ্যতে ব্যবহারকারী হারানোর ঝুঁকিতে থাকা ভাষা — প্রায় ১,৫০০টি।
❖ বিশ্বের ভাষাসমূহের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডার — Ethnologue।
❖ UNESCO-এর পূর্ণরূপ — United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization।
❖ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস — ২১ ফেব্রুয়ারি।
❖ জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে — ১৯৯৯ সালে (UNESCO-এর সাধারণ সম্মেলনে)।
❖ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন শুরু হয় — ২০০০ সালে।
❖ আদিবাসী ভাষার আন্তর্জাতিক দশক — ২০২২–২০৩২।
❖ বাংলা ভাষার মূল ভাষাপরিবার — ইন্দো-ইউরোপীয়।
❖ বাংলা ভাষার শাখা — ইন্দো-ইরানীয় ভাষাশাখার ইন্দো-আর্য উপশাখা।
❖ ভাষা ও উপভাষা — ভাষাবিজ্ঞানের দুটি সম্পর্কিত কিন্তু ভিন্ন শ্রেণিবিন্যাসগত ধারণা।
❖ জীবিত ভাষা (Living Language) — যে ভাষার বর্তমানে জীবিত ব্যবহারকারী রয়েছে; Ethnologue-এর হিসাবে অন্তত একজন মাতৃভাষী বক্তা থাকা গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
❖ বিলুপ্ত ভাষা (Extinct Language) — যে ভাষার আর জীবিত মাতৃভাষী বক্তা নেই।
❖ পৃথিবীর ভাষার সংখ্যা স্থির নয়; গবেষণা ও শ্রেণিবিভাগের পরিবর্তনের সঙ্গে হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।
◈ চূড়ান্ত উত্তর ও গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী
২০০৬ সালের পরীক্ষার প্রচলিত সঠিক উত্তর: খ. সাড়ে তিন হাজার।
২০২৬ সালের আধুনিক তথ্য অনুযায়ী সঠিক উত্তর: প্রায় সাত হাজারের বেশি (Ethnologue অনুযায়ী ৭,১৭০টি)।
অতএব, প্রশ্নটির ‘বর্তমানে’ শব্দটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল। ২০০৬ সা