ব্যাখ্যা:
উত্তর: ক
• ◈ সঠিক উত্তর: উনিশ শতকে
✦ বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
❖ প্রচলিত বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসের যুগবিভাগে ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ শুরু ধরা হয়। ১৮০১ সাল যেহেতু উনিশ শতকের প্রথম বছর, তাই সঠিক উত্তর ক. উনিশ শতকে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যেও ১৮০১ থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়কে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ বলা হয়েছে।
❖ আধুনিক যুগের সূচনাপর্বে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা:
➤ ১৮০০ — ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা।
➤ ১৮০০ — শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের সক্রিয়তা ও বাংলা গদ্য মুদ্রণ।
➤ ১৮০১ — বাংলা গদ্যগ্রন্থ রচনায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের তৎপরতা।
➤ পরবর্তী সময়ে সংবাদপত্র, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প ইত্যাদির বিকাশ।
❖ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ছিল মূলত পদ্যনির্ভর ও ধর্মকেন্দ্রিক। আধুনিক যুগে সাহিত্য মানুষের ব্যক্তিমানস, সমাজ, রাষ্ট্র, দেশপ্রেম, মানবতাবোধ ও বাস্তবজীবনের দিকে অধিক মনোযোগ দেয়।
✦ আধুনিক যুগের সাধারণ বৈশিষ্ট্য:
➤ গদ্যের বিকাশ
➤ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য
➤ জাতীয়তাবোধ ও স্বদেশচেতনা
➤ মানবতাবাদ
➤ যুক্তিবাদ ও সমাজসচেতনতা
➤ উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধের বিস্তার।
✦ মনে রাখুন:
⇒ প্রাচীন যুগ → আনুমানিক ৬৫০/৯৫০–১২০০
⇒ মধ্যযুগ → ১২০১–১৮০০
⇒ আধুনিক যুগ → ১৮০১–বর্তমান
এটি চাকরির পরীক্ষার প্রচলিত যুগবিভাগ।
০৫. বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম গদ্যগ্রন্থ কোনটি? (ডাক অধিদপ্তরের উপজেলা পোস্টমাস্টার: ২৪ / সমন্বিত ৭ ব্যাংকের অফিসার: ২৩)
ক. সেক শুভোদয়া
খ. কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ
গ. মিশন সমাচার
ঘ. মঙ্গল সমাচার
ঘ. মঙ্গল সমাচার
◈ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-সংশোধনী: প্রশ্নটির উত্তর ও গ্রন্থের নামের মধ্যে ঐতিহাসিক অসংগতি রয়েছে। বিভিন্ন চাকরির প্রশ্নব্যাংকে গ. মিশন সমাচার দেওয়া হলেও বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ১৮০০ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটির প্রকৃত নাম ‘মঙ্গল সমাচার’, অর্থাৎ ঘ বিকল্পটি। আবার বাংলা ভাষায় রোমান হরফে মুদ্রিত ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ ১৭৪৩ সালেই প্রকাশিত হয়েছিল, যা আরও প্রাচীন। তাই প্রশ্নে বাংলা হরফের শর্ত না থাকলে একক নির্ভুল উত্তর নির্ধারণে সমস্যা হয়।
✦ বিস্তারিত ব্যাখ্যা
❖ বাংলা গদ্যের ইতিহাসে ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ এবং ‘মঙ্গল সমাচার’ দুটি পৃথক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এদের মুদ্রণকাল, মুদ্রণস্থান ও ব্যবহৃত হরফ আলাদা।
❖ ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ ১৭৪৩ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে রোমান হরফে মুদ্রিত হয়। গ্রন্থটির রচয়িতা পর্তুগিজ ধর্মপ্রচারক মানোএল দা আসসুম্পসাঁও।
❖ এটি বাংলা ভাষার প্রাচীন মুদ্রিত গদ্যনিদর্শন। যদিও এর ভাষা বাংলা, মুদ্রণে বাংলা বর্ণমালার পরিবর্তে রোমান অক্ষর ব্যবহৃত হয়েছে।
❖ অন্যদিকে ‘মঙ্গল সমাচার মতীয়ের রচিত’ ১৮০০ সালের আগস্টে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে বাংলা হরফে প্রকাশিত হয়।
❖ গ্রন্থটি খ্রিষ্টধর্মের নিউ টেস্টামেন্ট-এর Gospel According to Matthew, অর্থাৎ মথি লিখিত সুসমাচারের বাংলা অনুবাদ।
❖ মথি মূল ধর্মগ্রন্থের লেখক হিসেবে চিহ্নিত; বাংলা অনুবাদ ও প্রকাশনার উদ্যোগের সঙ্গে উইলিয়াম কেরি এবং শ্রীরামপুর মিশনের সহযোগীরা যুক্ত ছিলেন। তাই মথিকে সরাসরি বাংলা অনুবাদক বলা যথাযথ নয়।
❖ শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের মুদ্রণকাজ পরিচালনায় উইলিয়াম ওয়ার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলা হরফ নির্মাণ ও মুদ্রণপ্রযুক্তির বিকাশে পঞ্চানন কর্মকারেরও অবদান রয়েছে।
❖ বাংলাপিডিয়ার ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’ নিবন্ধে স্পষ্টভাবে ‘মঙ্গল সমাচার’ নামটি উল্লেখ করা হয়েছে এবং একে বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ বলা হয়েছে।
❖ এ কারণে প্রশ্নব্যাংকে প্রচলিত ‘মিশন সমাচার’ নামটির পরিবর্তে ‘মঙ্গল সমাচার’ ঐতিহাসিকভাবে অধিক নির্ভরযোগ্য নাম।
✦ ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
❖ রচয়িতা — মানোএল দা আসসুম্পসাঁও, একজন পর্তুগিজ খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক।
❖ গ্রন্থটি আনুমানিক ১৭৩৫ সালে রচিত এবং ১৭৪৩ সালে প্রকাশিত।
❖ প্রকাশস্থান — পর্তুগালের রাজধানী লিসবন।
❖ মুদ্রণের হরফ — রোমান। অর্থাৎ বাংলা ভাষার বাক্য লেখা হয়েছিল রোমান অক্ষরে।
❖ গ্রন্থটিতে ধর্মীয় গুরু ও শিষ্যের কথোপকথনের মাধ্যমে খ্রিষ্টধর্মীয় শিক্ষা ও মতবাদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
❖ একই সময়ে লিসবন থেকে ‘ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ’ নামে আরেকটি বাংলা গদ্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এর রচয়িতা দোম আন্তোনিও।
❖ এই দুটি গ্রন্থ প্রমাণ করে যে বাংলা গদ্যের মুদ্রণ-ইতিহাস ১৮০০ সালের আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।
✦ ‘মঙ্গল সমাচার’ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
❖ প্রকাশকাল — ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট।
❖ প্রকাশস্থান — শ্রীরামপুর মিশন প্রেস।
❖ গ্রন্থের পরিচিত পূর্ণ শিরোনাম — ‘মঙ্গল সমাচার মতীয়ের রচিত’।
❖ মূল বিষয় — বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের মথি-লিখিত সুসমাচার।
❖ বাংলা অনুবাদ ও মুদ্রণকাজের সঙ্গে উইলিয়াম কেরি এবং শ্রীরামপুর মিশনের কর্মীরা যুক্ত ছিলেন।
❖ এটি বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ হিসেবে বাংলাপিডিয়ায় চিহ্নিত।
❖ এই গ্রন্থ প্রকাশ বাংলা মুদ্রণশিল্পের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
✦ বাংলা গদ্যের ইতিহাসে তিনটি পৃথক ‘প্রথম’ পরিচয়
❖ ১. বাংলা ভাষার প্রাচীন মুদ্রিত গদ্যগ্রন্থ (রোমান হরফে)
➤ কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ — ১৭৪৩, লিসবন।
❖ ২. বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ
➤ মঙ্গল সমাচার — ১৮০০, শ্রীরামপুর।
❖ ৩. বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম মৌলিক বাংলা গদ্যগ্রন্থ হিসেবে পরিচিত সাহিত্যিক রচনা
➤ রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র — রামরাম বসু, ১৮০১। এখানে ধর্মগ্রন্থের অনুবাদের পরিবর্তে মৌলিক বাংলা গদ্যরচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
◉ অন্যান্য অপশনগুলোর বিশ্লেষণ
❖ ক. সেক শুভোদয়া — ভুল।
‘সেখশুভোদয়া’ সংস্কৃত গদ্য-পদ্যে রচিত একটি চম্পূকাব্য। এতে শেখের মাহাত্ম্যসংক্রান্ত আখ্যান রয়েছে এবং মোট ২৫টি অধ্যায় আছে।
গ্রন্থটির রচয়িতা হিসেবে হলায়ুধ মিশ্রের নাম প্রচলিত হলেও বাংলাপিডিয়ায় লেখকত্ব ও রচনাকাল নিয়ে গবেষকদের সন্দেহের কথা উল্লেখ রয়েছে। এটি আলোচ্য প্রথম মুদ্রিত বাংলা গদ্যগ্রন্থ নয়।
❖ খ. কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ — আক্ষরিক প্রশ্ন অনুযায়ী ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
১৭৪৩ সালে বাংলা ভাষায় রোমান হরফে গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়েছে। ফলে বাংলা হরফের শর্ত ছাড়া শুধু মুদ্রিত বাংলা গদ্যগ্রন্থের প্রাচীনত্ব বিচার করলে এটি ১৮০০ সালের মঙ্গল সমাচারের চেয়ে আগের।
❖ গ. মিশন সমাচার — প্রশ্নব্যাংকের প্রচলিত উত্তর, কিন্তু নামগতভাবে সমস্যাযুক্ত।
একাধিক চাকরির প্রশ্নসমাধানে ‘মিশন সমাচার’ উত্তর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের ঐতিহাসিক বিবরণে গ্রন্থটির নাম ‘মঙ্গল সমাচার’। ‘মিশন সমাচার’ নামে একই গ্রন্থের স্বতন্ত্র প্রামাণ্য শিরোনাম নিশ্চিত করা যায়নি।
❖ ঘ. মঙ্গল সমাচার — বাংলা হরফে প্রথম গ্রন্থ বোঝালে সঠিক।
১৮০০ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে প্রকাশিত মঙ্গল সমাচার বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ। প্রশ্নটির উদ্দেশ্য যদি বাংলা হরফে প্রথম মুদ্রিত গদ্যগ্রন্থ বোঝানো হয়, তাহলে এটিই ঐতিহাসিকভাবে সঠিক বিকল্প।
✦ পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন
➤ চাকরির প্রশ্নব্যাংকে প্রচলিত উত্তর — গ. মিশন সমাচার।
➤ ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত গ্রন্থের নাম — মঙ্গল সমাচার।
➤ বাংলা হরফে প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ — মঙ্গল সমাচার (১৮০০)।
➤ বাংলা ভাষার প্রাচীন রোমান হরফে মুদ্রিত গদ্যগ্রন্থ — কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ (১৭৪৩)।
➤ কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদের রচয়িতা — মানোএল দা আসসুম্পসাঁও।
➤ কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদের প্রকাশস্থান — লিসবন, পর্তুগাল।
➤ কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদের মুদ্রণলিপি — রোমান।
➤ মঙ্গল সমাচারের প্রকাশস্থান — শ্রীরামপুর মিশন প্রেস।
➤ মঙ্গল সমাচারের প্রকাশকাল — আগস্ট, ১৮০০।
➤ মঙ্গল সমাচারের মূল ধর্মগ্রন্থ — মথি-লিখিত সুসমাচার।
➤ শ্রীরামপুর মিশনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব — উইলিয়াম কেরি ও উইলিয়াম ওয়ার্ড।
➤ বাংলা মুদ্রণহরফের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি — পঞ্চানন কর্মকার।
➤ রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্রের রচয়িতা — রামরাম বসু।
➤ রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র প্রকাশ — ১৮০১।
➤ সেখশুভোদয়া — সংস্কৃত চম্পূকাব্য।
➤ সেখশুভোদয়ার অধ্যায়সংখ্যা — ২৫টি।
➤ মনে রাখার সূত্র — ১৭৪৩ ⇒ কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ (রোমান হরফ); ১৮০০ ⇒ মঙ্গল সমাচার (বাংলা হরফ); ১৮০১ ⇒ রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (মৌলিক গদ্য)।
◈ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
এই প্রশ্নটির বিকল্পগুলো সংশোধন করা প্রয়োজন। পরীক্ষার প্রচলিত উত্তর গ হলেও তা ইতিহাসসম্মত শিরোনাম নয়।
শুধু বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রাচীন গদ্যগ্রন্থ জানতে চাইলে — খ. কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ।
বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ জানতে চাইলে — ঘ. মঙ্গল সমাচার।
প্রদত্ত পরীক্ষার প্রচলিত সমাধান — গ. মিশন সমাচার।
প্রশ্নব্যাংকে নির্ভুলভাবে রাখার জন্য প্রশ্নটি ‘বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ কোনটি?’ করে উত্তর ঘ. মঙ্গল সমাচার নির্ধারণ করা অধিক উপযুক্ত।